স্মরণ ; স্মৃতির পাতায় প্রিয় শরমিন আপু

মাহফুজ শাকিলঃ কুলাউড়া ইয়াকুব তাজুল মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ২০১০ ব্যাচের বিএসএস ৩য় বর্ষের মেধাবী ছাত্রী হলেন মাকসুদা আক্তার শরমিন। শরমিন আপু বাংলাদেশ রেলওয়ে কুলাউড়া জংশন ষ্টেশনের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাজি আব্দুল হাই (গার্ড) ও গৃহিণী রোকেয়া বেগমের কনিষ্ঠ কন্যা। পরিবারের ৩ বোন ও ১ ভাইয়ের মধ্য শরমিন ছিল তৃতীয়। শরমিন আপু ছিল সবার প্রিয় মুখ। সেই প্রিয় আপুকে নিয়ে আজ লিখতে বসলাম। কারণ গতকাল ১৮ অক্টোবর ছিল তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। শরমিন আপু আমার ব্যক্তি জীবনের প্রিয় এক আপু'র নাম। সে আমাকে অনেক স্নেহ ও ভালবাসত। তাঁর এ স্নেহাস্পদ ভালবাসা ও মিষ্টি কথা গুলো আমি কোনদিন ভূলতে পারবনা। সবসময় তাঁর মিষ্টি মুখের হাসি ও সুন্দর সুন্দর সাবলীল কথাগুলো এখন আমার মনে ভীষণ পীড়া দেয়। আপু'র সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় ২০১০ সালের শেষের দিকে। আপু'র প্রিয় বান্ধবী বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাসরত ফারজানা আক্তার লিমা আপুর মাধ্যমে। লিমা আপু আমাকে শরমিন আপু'র অসুস্থতার কথা বলেছিলেন। তখন লিমা আপুর হৃদয় কাঁপানো কথাগুলো শুনে আমি শরমিন আপুর পাশে দাড়িয়েছিলাম সামান্য সহযোগীতা নিয়ে। প্রথমে আপুর সাথে কথা বলি। আপুর মিষ্টি মুখের কণ্ঠ ও হৃদয় জাগানিয়া হাসি শুনে আমি আপুর একজন প্রিয় মানুষ হয়ে গেলাম। স্বীকৃত পেলাম ছোটভাইয়ের। সে থেকে নিয়মিত আপুর পরিবারের সাথে আমার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে আমি ঢাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার আব্বাকে নিয়ে যাই চিকিৎসার জন্য। তখন শরমিন আপু ও আন্টি হাসপাতালে আসলেন আব্বাকে দেখতে। এই হাসপাতালে শরমিন আপুর সাথে আমার প্রথম দেখা। তারপর আপুর আমন্ত্রণে ঢাকা মোহাম্মদপুরের তাদের বাসায় আমি যাই। প্রথমেই সবার সাথে দেখা। তারপর অনেক কথা হয় তাঁর পরিবারের সকলের সাথে। ওইদিন রাত্রিযাপন করলাম তাদের বাসায়। আপুর ছোটভাই বন্ধুবর রাশেদ ও আমি একি বিছানায় ঘুমালাম। সকাল হল। শরমিন আপু আমাকে ও রাশেদকে ডাকতেছে। আমাকে মিষ্টি সুরে বলতেছে এই শাকিল তুমি ঘুম থেকে উঠো। বেলা অনেক হয়ে গেল। নাস্তা করবেনা। সেই দিনের সেই মিষ্টি কথাগুলো এখন আমার মনে ভীষণ পীড়া দিচ্ছে। পরবর্তীতে আমি চলে আসলাম কুলাউড়ায়। চলে আসার পর বছরখানেক সময় আপুর সাথে আমার কথা হয়। ২০১৪ সালে আপু ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে দেখতে আমি আবার ঢাকায় গেলাম। ২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর। সে তখন ঢাকা আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। আমি প্রথমেই তাদের বাসায় গেলাম। সেখান থেকে আপুর মেঝবোন আইরিন আপুকে নিয়ে আমি চলে গেলাম হাসপাতালে তাকে দেখতে। সেই দেখা ছিল শরমিন আপুর সাথে আমার জীবনের শেষ দেখা। অনেক কথা হয়। আপুর অবস্থা দেখে আমার মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেল। আপুর মিষ্টি চেহারা যেন মলিন হয়ে গেল। কিন্তুু আপুর মিষ্টি কথাগুলো ও হাসি অটুট রয়েছে। আপু আমাকে আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলল, শাকিল তুমি আপুর জন্য দোয়া কর। আমি যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারি। আপুর শেষ আকুতি ছিল আমার কাছে যে, আমি আবার ঢাকায় আসলে তার জন্য সিলেটের সাতকরা নিয়ে যেতে। তাঁর খুব প্রিয় একটা খাবারের মধ্য অন্যতম ছিল সিলেটের সাতকরা। আমি তাকে বলেছিলাম, আপু তোমার জন্য আমি সাতকরা নিয়ে আসব। আমি সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে আসলাম কুলাউড়ায়। কিন্তুু আপুর সে কথাটা আমি রাখতে পারলামনা। ২০১৪ সালের ১৭ অক্টোবর বিকালে হাসপাতাল থেকে রাশেদের ফোন এসেছে। সে বলল, শরমিন এর অবস্থা খুবই গুরুতর। তাকে উন্নত চিকিৎসা দেয়ার জন্য ঢাকা মিরপুরের মাস্ক হাসপাতালের আইসিউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। এ সংবাদ শুনে আমি অনেকটা চিন্তায় পড়ে গেলাম। এরপর দিবাগত রাত ১ টা ১০ মিনিটে আইরিন আপুর ফোন আসলো। আপু কান্নাজড়িত কন্ঠে বললেন, শাকিল তোমার শরমিন আপু আর নেই। মৃত্যুর এ সংবাদ শুনে আমি শোকে নিথর হয়ে গেলাম। কি বলে যে আইরিন আপুকে আমি সান্ত্বনা দেব সে ভাষা আমার জানা নেই। পরে ভোররাতে ঢাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্স যোগে লক্ষীপুর জেলার চরশাহী গ্রামের তাঁর নিজ বাড়িতে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। তার মৃত্যুতে তাদের এলাকায় শোকের মাতম শুরু হয়। ওইদিন দুপুরে তার নিজ গ্রামের মসজিদের পাশে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে একই জেলার পাঁচতারা গ্রামে তাঁর নানা বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। মেধাবী শরমিন আপুর এই কঠিন দুরারোগ্য ব্যাধি ধরা পড়ে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। দীর্ঘ পাঁচ বছর মরণব্যাধি লিউকোমিয়া ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে জীবনের কাছে পরাজয় বরণ করে নিতে হলো শরমিন আপুকে। ডাক্তার ও পরিবারের সবার অদম্য প্রচেষ্টাও বাঁচাতে পারল না তাকে। সবাইকে কাঁদিয়ে অতি অল্প বয়সেই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে সে চলে গেছে না ফেরার দেশে। যেখান থেকে কেউ কোনদিন ফিরে আসতে পারবেনা। পৃথিবীতে আরো কিছুদিন বাঁচার অনেক স্বাদ ও স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তুু সৃষ্টিকর্তার প্রাকৃতিক নিয়মের কাছে তাকে হার মানতে হল। পরিশেষে আপু তোমার মিষ্টিমুখের হাসি ও সুন্দর সুন্দর কথাগুলো আমার জীবনে আজীবন স্মৃতি হয়ে থাকবো। আমি মহান আল্লাহ পাকের কাছে আমি আকুল প্রার্থনা করি যে, তিনি যেন তোমাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।

Post a Comment

Previous Post Next Post