এক.
গুণীজন বলেন ডাক্তার আর উকিলের কাছে কিছু লুকিয়োনা। তাতে ভালোর চেয়ে মন্দ হবার সম্ভাবনা বেশী। অনেক ডাক্তারের বিরুদ্ধে রোগীদের কথা না শুনার যেমন অভিযোগ আছে তেমনি অনেক রোগী আছেন যারা ডাক্তারের কাছে গিয়ে কি বলতে গিয়ে কি বলেন, খেই হারিয়ে ফেলেন। ফলে ডাক্তার হয়ে যায় বিরক্ত কখনো বা উত্তেজিত।
একজন চিকিৎসক কখনোই চাননা তাঁর কারনে কোন রোগী দূর্ভোগ পোহাক বা তাঁর কোন দূর্নাম হোক। তারপর ও আমরা প্রতিদিন চিকিৎসক দের নামে এহেন নানান অভিযোগ অনুযোগ শুনতে পাচ্ছি। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কে সুরক্ষিত রাখতে এবং এর সুনাম ধরে রাখতে এ সকল প্রত্যেকটি অভিযোগ অনুযোগ এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিৎ। দোষী হলে বিচার করা উচিৎ।
রোগীরা প্রায়শই অভিযোগ করেন, ডাক্তার সাহেব বলেছিলেন আমার রোগ কখনই ভালো হবো না। কেনো হবেনা জিগ্যেস করায় তিনি দুর্বব্যবহার করে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিদেশে গিয়েছিলাম, তারা বলেছে কিছুই হয়নি। সব রিপোর্ট ভুয়া। তারা সকল টেস্ট আবার করেছে। খুব ভালো ব্যবহার আর আদর যত্ন করেছে। তবে বলেছে অনেক দেরী হয়ে গেছে। আরো আগে আসলে নাকি ভালো হতো। এরকম ডিপ্লোম্যাটিক টাইপ কথাবার্তা।
আসলে এসব কথাবার্তা অনেক প্যাঁচালো, মুখে মুখে ধ্বনিত হওয়ায় তা অনেক পরিবর্তিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে এগুলো অনেকটা প্রতিহিংসা মুলক কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আর এসব উক্তি বেশির ভাগ দালাল রাই করে, অনেক টা মুল উক্তিকে টুইস্ট করে। মনে রাখবেন বিদেশী হাসপাতালের বা ডাক্তারদের অনেক দালাল বা এজেন্ট আছে আমাদের দেশে। বিজ্ঞজন বলেন এসব দালাল রোগী কে ভাগিয়ে নিয়ে বিদেশি হাসপাতালে ভর্তি করতে পারলে তার লভ্যাংশ থেকে একটা কমিশন পায় বিদেশী হাসপাতাল বা চিকিৎসক দের কাছ থেকে।
চিকিৎসা-প্রযুক্তি গত দিক দিয়ে আমাদের দেশ কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়ত পিছিয়ে থাকতে পারে তবে চিকিৎসক দের জ্ঞান, যশ, অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলে আমাদের দেশের চিকিৎসক গন পাশ্চাত্যের অনেক দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমপর্যায়ের পড়েন, এটা পাশ্চাত্যের চিকিৎসকরা অনায়াসে স্বীকার করেন।
তাই আমি বলবো অযথা আবেগ এর বশবর্তী না হয়ে কিংবা কোন দালালের খপ্পরে বা ফাঁদে পা না দিয়ে বরং বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিন। এক্ষেত্রে কেবল মাত্র আপনার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যার তত্ত্বাবধানে আছেন তার "স্বতঃস্ফূর্ত" পরামর্শ মেনেই আপনি আপনার রোগীকে নিয়ে রেফার্ড চিকিৎসক বা বিদেশের হাসপাতালে যাবেন। চিকিৎসার ব্যাপারে সর্বদা একজন চিকিৎসক এর পরামর্শ নিয়েই চলা উচিৎ। নন ডাক্তার বন্ধু বান্ধবী আত্মীয়স্বজন বা আর কারো পরামর্শ মতো চললে তা আপনার বা আপনার রোগীর জন্য কেবল দূর্ভোগই নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু আপনার অভিযোগ, আপনার ডাক্তার আপনার কথা শুনেন না।
দুই.
আসুন এবার একটু ব্যতিক্রমী প্রসংগে আসি। চিকিৎসক দেবতা নন। তিনি ও আপনার মতই একজন মানুষ। রাগ ক্ষোভ মান অভিমান তারও থাকতে পারে। আপনার সুচিকিৎসার স্বার্থে তাই আপনার চিকিৎসক কে সহযোগিতা করা উচিৎ । আপনি যেমন তীর্যক কথা বার্তায় বিব্রত হন একজন চিকিৎসকও তেমনি তার ব্যপারে তীর্যক মন্তব্যে বিব্রত হন। চিকিৎসক কে বিব্রতকর কিছু বলা হলে বা করা হলে তা চিকিৎসক এর চিকিৎসার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এতে আপনার সুচিকিৎসা যতটা হতে পারতো, তার ব্যত্যয় হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
চিকিৎসক বা চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা এখন আপনাকেই করতে হবে। আমরা অনেকে নিজের অজান্তে চিকিৎসক কে সেবা নেবার সময় নানা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন বা তীর্যক মন্তব্য করে তাকে বিব্রত করে তুলি। যা কখনই উচিৎ নয়। মনে রাখবেন আপনি যেমন চিকিৎসকের কাছে ভালো ব্যবহার আশা করেন তদ্রূপ একজন চিকিৎসক ও আপনার কাছ থেকে ভালো ব্যবহার আশা করেন।
চিকিৎসক কে এমন কিছু বলবেন না, যা তার জন্যে অপমান জনক। তাই আসুন এবার জেনে নেই চিকিৎসক কে কি বলা উচিৎ, কি বলা উচিৎ নয়।
আমরা অনেকেই আছি চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসক কে বলে বসি,
"আপনি কি এই রোগের চিকিৎসা জানেন..?"
কিংবা
"দেখুনতো, আপনি কি অতি উচ্চ মাত্রায় ঔষধ দিয়ে দিলেন কিনা..?" বা
"আপনি বাজে কোম্পানির ঔষধ প্রেসক্রাইভ করলেন কিনা..?"
এরকম প্রশ্ন অনেক সময় চিকিৎসক কে বিব্রত অবস্থায় ফেলে দেয়। আর এসব প্রশ্নের জন্যে তাঁরা অনেক সময় রিয়্যেক্টও করে বসেন। তাই নিজের বা আত্মীয়স্বজনের সুচিকিৎসায় আপনি কখনোই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলো করতে যাবেন না,
#আপনি কি এ রোগ সম্পর্কে জানেন? আপনি আমাকে সঠিক ঔষধ দিচ্ছেন? আপনি কি চিকিৎসা করতে পারেন?
#আপনি কি রোগের বিশেষজ্ঞ ? বা আপনার ঔষধ কি আদৌ কাজ করবে?
#যা দিলেন তার চেয়ে ভালো ঔষধ নাই? বা আপনার চিকিৎসা না নিয়ে বরং বিদেশে যাই?
#ঔষধ কি খাবো, না আর কারো কাছে যাবো? এই ঔষধের কি বড় ধরনের সাইড এফেক্ট হয় বা এই ঔষধ খেলে মানুষ মরে যায় ?
#প্রেশক্রিপশনের সকল ঔষধ কিনবো? আপনার ঔষধ না খেয়ে কি অপেক্ষা করি? বা এটা না খেলে কি হবে ওটা না খেলে কি হবে?
#পরীক্ষা গুলো না করলে হবে? পরীক্ষা কমিয়ে দেয়া যায়না? আমাকে কোনও পরীক্ষা দিবেন না বা আমাকে রক্তের সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেনো দিচ্ছেন না ?
#আপনি কি বড় ডাক্তার? আপনার চেয়ে ভালো ডাক্তার কি আছেন? আপনার বিদেশী ডিগ্রী আছে?
বা আপনি কি প্রফেসর?
#আপনার চেম্বারে এতো ভীড় কেনো? বা আপনার চেম্বারে রোগী নাই কেনো?
#আপনি কি পাওয়ারফুল ঔষধ দেন? আমাকে কম পাওয়ারের ঔষধ দিবেন, ওকে?
#আমি দেশের চিকিৎসক দের দিয়ে চিকিৎসা করাইনা, না পেরে আসলাম, আপনার টা নিবো? ক্ষতি হবে আমার?
#ডাক্তার আপনি কি বিবাহিত? ডাক্তার আপনার বাড়ি কই? আপনার বিদেশি ডিগ্রী কয়টা?
হাস্যকর বা অযৌক্তিক হলেও এ সকল প্রশ্ন কমবেশি আমরা প্রায়ই চিকিৎসক কে করে বসি। হয়ত না বুঝে সহজ সরল ভাবেই করি। আমি বলছি না এসকল প্রশ্ন করা যাবেনা।
তিন.
আপনার অনেক জিজ্ঞাসা থাকতে পারে। এটা আপনার অধিকার। তবে একটা ব্যাপার মনে রাখবেন, উপস্থাপনা বা বাচন ভংগীতে ভালো জিনিস ও অনেক সময় খারাপ হয়ে যায়। গ্লাসে যদি জল থাকে তবে তা তিন ভাবে প্রকাশ করা যায়,
১) গ্লাস অর্ধেক খালি ২) গ্লাসে অর্ধেক
জল রয়েছে
৩) গ্লাসে অর্ধেক জল বাকী অর্ধেক অক্সিজেন।
বিষয়টি আরো সহজ করে বলি, ধরুন আপনি একজন প্রতিযশা সাংবাদিক। পাঠক বললো,
"ভাই, আপনি কি রিপোর্ট লিখতে জানেন..?"
অথবা ধরুন আপনি একজন আইনজীবী, মক্কেল প্রশ্ন করলো, "আপনি কি আইন সম্পর্কে ভালো জানেন..."? বা একজন উচ্চমানের সংগীত শিল্পী শ্রোতা বললো, "ম্যাডাম, আপনি কি সারেগামা জানেন...?" একজন স্বনামধন্য আর্কিটেক্ট কে, বাড়ি বানাতে গিয়ে বললেন, "ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, আপনি জানেন এক স্কয়ার ফুট ঢালাইতে কত কেজি রড লাগে..?" বা ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, "রড কমিয়ে তার পরিবর্তিতে দুইটা বাঁশ দিলে হয়না..?" এসব প্রশ্ন হাস্যকর, সম্মানহানি কর বটে ।
আপনার স্থাপনায় রডের পরিবর্তে বাঁশ দিতে চাইলে আপনি আর্কিটেক্ট সাহেব কে বড় জোর বলতে পারেন, "ভাই, রডের পরিবর্তে কেউ বাঁশ দিলে কি পরিণতি হবে...?"
আচ্ছা বলুন কেউ যদি ফার্স্ট ডেটে গিয়ে তার প্রেমিকা কে বলে, "তোমার বয়স কত" তাহলে কি "সেটা আত্মঘাতী গোল" কিংবা "ডি বক্সে ফাউল" হয় না?
আপনার জ্ঞাতার্থেই বলছি, চিকিৎসা বিষয়ক উপরোক্ত প্রশ্নগুলো সরাসরি এভাবে না করে বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে করুন বা ডিপ্লোম্যাটিক হোন। আপনার অধিকার আছে আপনার চিকিৎসক এর কাছ থেকে রোগ সম্পর্কে সব কিছু জানার, তবে সেটা মানহানিকর প্রশ্নের মাধ্যমে নয়। যেমন আপনি অন্য চিকিৎসক দেখাতে চাইলে বলতে পারেন,
"ডাক্তার সাহেব, আপনি যা পরামর্শ দিবেন আমি তাই শুনবো, যেখানে যেতে বলবেন সেখানেই যাবো..", ব্যাস এটুকু। বিজ্ঞ চিকিৎসক বুঝে নেবেন আপনি কি বলতে চাইছেন।
হ্যাঁ আপনি বলতে পারেন, রোগে শোকে থাকলে বা পড়লে রোগী বা স্বজনরা অনেক সময় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। মুখ ফসকে, আবেগে কি বলতে কি বলে ফেলেন। তাই চিকিৎসক মহোদয় দের প্রতিও আমার আকুল আবেদন থাকবে, রোগী বা স্বজন দের এ ধরনের "গুগলি" প্রশ্নে আপনাদের যেনো কষ্মিনকালে ধৈর্যচ্যুতি না হয়।
লেখাটি শেষ করি এক ব্রাহ্মণ পরিবারের করুন কাহিনী দিয়ে। আমি তখন নবীন চিকিৎসক। কলে গিয়েছি একেবারে রিমোট এলাকায় তিন চার কিলো কাদাজল মাড়িয়ে। গিয়ে দেখি নেহায়েত দারিদ্র ব্রাহ্মণের ঘরে বসার কিছুই নেই। দারিদ্র ব্রাহ্মণ গায়ের গামছা খুলে একটা পিড়ি এনে সযত্নে মুছে দিয়ে বললেন,
"আপনি ভগবান। মার্জনা করবেন। আপনাকে বসতে দেওয়ার জন্যে ঘরে একটা চেয়ার নেই।"
তাঁর সম্মান প্রদর্শনে মুগ্ধ হয়ে বিনা ফী তে খুব ঝুঁকি নিয়ে তার বাবার চিকিৎসা করি। সে যাত্রায় পরম দয়ালু আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন। চিকিৎসক এর প্রতি শ্রদ্ধা বিশ্বাস আস্থা না থাকলে আপনার রোগ সারাটা মুশকিল হয়ে যেতে পারে।
লেখকঃ ডা. মো. সাঈদ এনাম।
সাইকিয়াট্রিস্ট
ডি এম সি, কে-৫২।
৪/৬/১৮
