ডা. সাঈদ এনামঃ ক'দিন থেকে রাস্তায় হাটু পানি। পাহাড়ি ঢলে নদীর জ্বল উপচে পড়ে পার্শ্ববর্তী আঁকাবাঁকা সড়ক একেবারে ডুবিয়ে নিয়েছে। ড্রাইভার বললো স্যার এতো পানি মাড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবেনা। যদি পরে কোন সমস্যা করে। বললাম থাক, আজ তবে লোকাল বাসেই যাই।
ক'দিন থেকে হাসপাতালের যাবার জন্য একটা গাড়ি রেন্ট করেছি। গাড়িটি আমার বন্ধুর। মাসিক ভিত্তিতে রেন্ট নেওয়া। বর্তমান পোস্টিং এর হাসপাতালটা একটু দূরে। ভেবেছিলাম জয়েন করেই ঢাকা গিয়ে একটা গাড়ি কিনে নিবো। কিন্তু যোগদান দিয়েই এতো ব্যস্ত হলাম যে ঢাকা যেতেই পারছিনা। তাই আপাতত একটা গাড়ি ড্রাইভার সমেত রেন্ট করলাম আসা যাওয়ার জন্যে।
যাক সে কথা, সত্যি গাড়ি নিয়ে পথিমধ্যে যদি দৈবাৎ জমে থাকা পানিতে আটকে যেয়ে অসুবিধে হয় তাহলে তো সমস্যা। এখন জুন মাস। নানান ব্যস্ততায় অফিসে। কাজের স্থুপ। একদিন দেরী হলে বেশ অসুবিধায় পড়তে হবে সবাইকে। তাই আজকে লোকাল বাসে রওয়ানা।
মফস্বলের বাস। হাওয়ার উপর চলে। অনেকটা হাওয়া মে উড়তা যায়ে, মেরা লক্কর ঝক্কর বাস হে ভাই বাস হে....টাইপের আরকি।
গাড়ির কাঁপুনি বা ঝাকুনি দেখে আপনাকে বুঝতে হবে, কত কিলোমিটার বেগে আছে আপনার গাড়ি। যদি গাড়ি কাঁপে তাহলে বুঝতে হবে তিরিশ কিলো বেগে আর যদি আপনি এবং অন্যান্য যাত্রী সহ পুরো গাড়িটা হেলে দুলে কাঁপতে থাকে তাইলে বুঝবেন গাড়ি পঞ্চাশ এ আছে। এটা তার সর্বোচ্চ গতি। তখন ফরজ কাজ হবে শেষমেস একবার আল্লাহ বা ভগবান কে ডেকে নেয়া। না জানি পারাপার থেকে পরপার হয়ে যান সবাই!!
তবে পারাপার বা পরপার যাই হোক, প্রাইভেট এসি গাড়ি টাড়ি ছেড়ে মাঝেমধ্যে লোকাল বাস বা লোকাল ট্রেনে সবার ভ্রমন করা উচিৎ। দেশের অরিজিনাল পিকচারটা খুব সহজেই জানতে পারা যায়।
স্টার্ট নেবার আগে ড্রাইভার হেলপার কে ডাকে,
"ওই জুম্মন দেখ চাক্কাচুক্কা ঠিক আচে নি, হাওয়া ভি লাগবনি"।
জুম্মন পিছন থেকে চিল্লা মারে,
"হয় উস্তাদ অসুবিধা নাইক্যা। ছব ফকফকা। আগান আল্লাহ ভরসা"।
"টিক আছে জুম্মন, তয় স্টার্ট দিলাম, একটা খিল্লি খিলা বে জুম্মন"।
জুম্মন পাশের টং দোকান থেকে একটা বাহারি পান আর আংগুলে একটু চুন ড্রাইভারের পাশের দরজা দিয়ে দেয়। ড্রাইভার হাতে পান নিয়ে হা করে মুখে নেয়। তারপর জিহবাটা ঈষৎ বের করে তার আগায় চুনলাগায়। পাশে একটা গামছা ঝুলানো। অনেক ময়লা। ঐটাতে ই আংগুল মুছে। তার পর তার ইমার্জেন্সি এক্সিট দরজা টা ঠিক আছে কিনা একটু চেক করে। লোকাল বাসের "ড্রাইভার ইমার্জেন্সী এক্সিট ডোর" বলে ড্রাইভার দের সিটের পাশে ছোট একটা দরজা থাকে, যেটা দিয়ে বিপদকালীন সময়ে সবার চোখে ফাঁকি দিয়ে ড্রাইভার টুপ করে সটকে পড়ে।
পান চাবাতে চাবাতে স্টিয়ারিং টা কে সালাম করে ড্রাইভার । একবার দুইবার তিনবার। সালাম ঠুকে আর চুমু খায়। তারপর স্টার্ট দেয়।
আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। তার হাব ভাব বুঝে নিচ্ছি। নাহ! ভালো লোক মনে হচ্ছে। একটু বয়স্ক। মুখে ছাপছাপ দাড়ি। ড্রাইভার হিসেবে বয়স্করা ভালো হয়। তারা ধীরস্থীর স্বভাবের হয়। তাই তাদের ডিমান্ড বেশি। বেতন ও বেশী।
গাড়ি চলতে শুরু করে। ড্রাইভার লুকিং গ্লাসে সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে নেয়। আমাকেও দেখে। একটা সালাম দেয়। মনে হয় আমাকে চিনে। আমি ঠিক চিনতে পারিনি। হবে হয়ত কোনদিন হাসপাতালের আউটডোর এ গিয়েছিলো বউ বাচ্চা নিয়ে।
পাশের সিটে বসেছে একটি বাচ্চা ছেলে। বয়স বারো কি তেরো। হাতে ছোট একটা ব্যাগ। পরনে অফ হোয়াইট কালারের পাঞ্জাবী, মাথায় একটা টুপি। রাস্তা ভালোনা। এখানে সেখানে গর্ত। তাই গাড়ির ঝাঁকুনিতে তার বমির ভাব হচ্ছিলো। আমি তার পিঠ টা একটু মেজে দেবার চেস্টা করলাম।
বমির ভাব হলে পিঠের শিড় দাড়া বরাবর একটু মেজে দিলে বমির ভাব খানিকটা কমে যায়। অনেকে আবার লেবুর পাতা, পান পাতা চিপে চিপে ঘ্রান শুঁকেন। অথবা লেবু চিবান। ওতে নাকি ভালো কাজ হয়। ঢাকাতে হাইওয়ের বাস গুলোতে পলথিনের ছোট ছোট প্যাকেট সিটে দেয়া থাকে। কিন্তু এখন এখানে লেবু পাতাও নেই পলিথিন ও নেই। তাই আমি এটাই চেস্টা করলাম। শির দাড়া বরাবর একটু উপর নীচ করে হাত বুলিয়ে দিলাম। দেখলাম ছেলেটা কিছুটা আরাম পেয়েছে।
চলন্ত গাড়িতে অনেকের মাথা ঘুরায়, বমির ভাব হয়। এটাকে বলে "মোশন সিকনেস"। যাদের মোশন সিকনেস আছে তাদের যাত্রা পুর্বে একটা বমির ঔষুধ খেতে নিতে হয়। এতে আর সমস্যা হয় না। আমার মেয়েটার এমন হয়। তাই মাঝে মধ্যে আমি অকে একটা এন্টি ইমেটিক দিই কোথাও জার্নি করলে।
ছেলেটার মাথা ধরা আর বমির ভাব কিছুটা কমেছে। আমাকে বললো,
আংকেল ধন্যবাদ
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
কি নাম, কোথায় যাবে?
তাওহীদ, সারিঘাট যাবো
কি ঈদের ছুটিতে?
জ্বী আংকেল
কি করো?
মাদ্রাসায় পড়ি
কোন ক্লাসে?
আংকেল ক্লাস নেই, আমি হিফজে পড়ি, কোরান হিফজ করছি?
হিফজে পড়ি শুনে আমি বেশ খুশি হলাম।
এই হিফজ পড়া বাচ্চাদের নিয়ে আমার বেশ আগ্রহ ছিলো। কতোদিন ভেবেছি একটা হিফজ মাদ্রাসায় যাবো। দেখি কিভাবে তারা পবিত্র কোরান পুরোটাই হুবুহু মুখস্থ করে ফেলে। পৃথিবীর এ এক আশ্চর্য বিষয়!!
মুসলমানেরা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পুরোটা মুখস্থ করে ফেলে। একেবারে জের জবর পেশ, তাহজিব বা দাড়ি কমা সেমিকোলন সহ। এবং আজীবনের জন্য। এটা সত্যি আল্লাহ তায়লার অপুর্ব নিদর্শন। আর কোন ধর্মগ্রন্থ এভাবে মুখস্থ কেউ করেনা বা করার বিধান তেমন করে নেই। থাকলে ভালো হতো। ধর্ম গুলো বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা পেতো। পবিত্র ধর্ম গুলো অধর্মীদের হাতে পড়ে ধীরে ধীরে বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। এজন্যি মানুষ সব দিন দিন অমানুষ আর হায়না হয়ে উঠছে।
তাকে জিজ্ঞাস করলাম
আচ্ছা তুমি কতটুকু মুখস্থ করেছো?
আঠারো সিপারা আংকেল
তা কতদিন লাগলো?
আড়াই বছর।
মাত্র!?
জী আংকেল। অনেকে তো দু বছরে পুরো হিফজ হয়ে যায়!
তাই নাকি?
জ্বী
তারা কারা, মানে কেমন ছাত্র?
তারা খুব ভালো। তাদের কাছ থেকে শয়তান দূরে দূরে থাকে তাই তারা তাড়াতাড়ি হিফজ করে!
তা তোমার কাছে কি শয়তান ঘুর ঘুর করে নাকি!?
ওহ হি হি হেসে দিলো..
আমি ও তার সাথে সাথে খানিকক্ষণ হাসলাম।
হাসি থামিয়ে এবার সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো
আপনি কোথায় যাবেন আংকেল?
আমি, আমি যাবো কানাইঘাট।
ওখানে কেনো?
আমি ডাক্তার। ঐখানে একটা বড় হাসপাতাল আছে আমি। ওইখানের ইউ এইচ এফ পি ও।
ও আচ্ছা। আংকেল আপনার বাড়ি কি ওখানে?
না বাপু। আমার বাড়ি কুলাউড়া তে।
আপনি ওখান থেকে আসতেছেন?
হ্যা
আমাদের মাদ্রসায় এক শিক্ষক আছেন। উনার বাড়ি কুলাউড়া তে।
তাই নাকি?
আচ্ছা আংকেল আপনার গাড়ি নেই, ডাক্তার দের তো গাড়ি থাকে। তারা সবসময় গাড়িতে চড়েন।
হুম নেই আবার আছেও বলতে পারো। আসলে আমি ওখানে নতুন জয়েন করেছিতো। এখনো কিনিনি।
.....
কানাইঘাট উপজেলায় আমার পোস্টিং মাত্র ক'দিন হলো। এইতো সেদিন পুর্বের কর্মস্থলে বসে বসে আমি আর স্কীন স্পেশালিষ্ট বাহার ভাই কি যেন একটা টপিক নিয়ে ইন্টারনেট ঘাঁটছিলাম। এ সময় হঠাৎ করে বাহার ভাই বললেল,
এই সাঈদ তুমি তো বদলী!
বুকটা ধড়াস করে উঠলো। অবাক হয়ে বললাম,
কি বলেন ভাই, ভালো করে দেখেন।
তিনি হেসে বললেন,
ভালো করে দেখেই বলছি। তবে ভয় পেয়োনা ভালো পোস্টে গেছো, মানে এখন থেকে তুমি আমার স্যার। "আসসালামু আলাইকুম" বলে দাঁড়িয়ে হেসে হেসে তিনি লম্বা একটা সালাম দিলেন।
ভাই রসিকতা ছাড়েন, খুলে বলুন, বলেই তার হাত থেকে মোবাইল নিয়ে ওর্ডার টি দেখলাম। তাইতো, আমি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসাবে প্রমোটেড হয়েছি।
..........
নতুন কর্মস্থল কানাইঘাট উপজেলা।
এই উপজেলা সিলেট হলেও কখনো যাওয়া হয়নি। কেবল নামটাই শুনা। তবে পরিচিত নাম। আমার এক ঘনিষ্ঠ এইচ এস সি কলেজমেট আ ন ম সুফিয়ান (Abu Nasar Muhammad Sufian) এর বাড়ি ছিলো কানাইঘাট। একটু ভালো লাগলো এই ভেবে যে একেবারে অপরিচিত জায়গা নয়। হাজার হোক বন্ধুর বাড়ি।
বন্ধুটির সাথে এই কদিন আগেও দেখা হয়েছে আমার। আমার বাসায় এসছিলো। আমেরিকা তে তার ডিপার্টমেন্টের কি একটা ট্রেনিং এ তাকেই যেতে হচ্ছে কয়েক মাসের জন্যে। যদিও এ মুহুর্তে তার অসুবিধা তবু তাকে যেতে হচ্ছে। আমার কাছে ও এসছিলো তার মেডিকেল কাগজ গুলো রেডি করতে। মেডিকেল ফিটনেস এর কি একটা রিপোর্ট এ সামান্য প্রবলেম ছিলো। আসলে প্রবলেম নয়। লোকাল ডাক্তার না বুঝে এটা করেছে। আমি তার কাগজ গুলো যত্ন করে আবার রেডি করে আমার স্বাক্ষর নাম ডিগ্রী ইত্যাদি সিল ছাপ্পর দিয়ে দিই। আমেরিকা এম্বেসি এক্সেপ্ট করে নেয়। কাজ হয়। সে ফ্লাই করে।
মুশকিলে পড়লাম। সে এখন আমেরিকায়। তার সাথে এলাকা সম্পর্কে একটা ব্রীফ নেবো সে উপায়টি ও এখন হাতে নাই।
আচ্ছা বাহার ভাই, বদলী যখন হয়েছে, পোষ্ট টাও ভালো। তাহলে যাই জয়েন করি। কি বলেন?
আরে যাবা মানে, অবস্যই যাবা মিয়া। এ ধরনের পোস্টিং বাগাতে মানুষ কি পরিমান তেল তদবির করে, তাতে তোমার আইডিয়া নেই! আর বলছো যাবো কিনা। যাও যাও। দুরের উপজেলা তাতে কি। পরে চলে আসবা ধারে কাছে কোথাও।
না বাহার ভাই একচুয়েলী আমি সহকারী অধ্যাপক পদের জন্য ট্রাই করছিলাম। ডিগ্রী কমপ্লিট, চাকুরীর বয়স ও হয়েছে....
আর ধুর মিয়া রাখো। ঐটা যখন হবে তখন হবে, এখন যাও...
কিন্তু আপনাদের কে তো মিস করবো ভাই।
"হ্যা তা ঠিক। আমি এই হেলথ কমপ্লেক্সে জুনিয়র কনসালটেন্ট হয়ে আসছিলাম তুমি ছিলে বলে। এখন দেখি তুমার যাবার সময় হয়ে গেলো"। বাহার ভাইয়ের গলাটা একটু ধরে আসলো।
অসুবিধা নাই, বাহার ভাই। আপনিও চলেন।
আরে না, আগে তুমি যাও জয়েন করো।পরে দেখা যাবে।
আলাপ ওখানে শেষ আমাদের। আমি বাসায় এসে একটু চিন্তিত হলাম। বাচ্চাগুলো সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। বাসায় কেবল আমি একা। আম্মা, ভাই সবাই আমেরিকা। এ মুহুর্তে ঐ প্রমোশন নেয়া কি ঠিক হবে। ফোন করলাম আমার সিভিল সার্জন স্যার ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী স্যার (Satyakam Chakraborty Sir) কে,
স্যার কি করবো। অনলাইনে বদলির ওর্ডার দেখলাম...
স্যার আমাকে খুব স্নেহ করেন। তিনি বললেন যাও চার্মি পোস্ট। এগুলোতো সবাই চেয়েও পায়না আবার সবাইকে দেওয়াও হয়না। জয়েন করো পরে দেখা যাবে...।
স্ত্রীর সাথে কথা বললাম। ও বললো আমিতো কিছু বুঝতেছিনা। সচিব ভাইকে ফোন করো।
রাতে ফোন করলাম আমার কাজিন কে। উনি বর্তমান সরকারের সিনিয়র সচিব। গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে। তিনিও একি কথা বললেন। তোমার সিভিল সার্জন স্যার যেহেতু বলছেন জয়েন করতে তুমি করো, পরে দেখা যাবে...।
উভয় মহোদয়ের এই "পরে দেখা যাবে" এর উপর ভর করে আর অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে সিদ্ধান্ত নেই জয়েন করবো।
গেলো কয়েক মাস থেকে থেকে ভাবছিলাম একটা গাড়ি কিনবো। ডিগ্রী নেবার পর ব্যস্ততা খানিকটা বেড়ে গিয়েছিলো। যাক এই পোস্টিং টাতে বোধহয় গাড়ি কিনা টা ফরজ হয়ে গেলো। আমেরিকায় আম্মা ভাই সকল কে জানিয়ে দিলাম নতুন জয়েনিং এর কথা।
এসব চিন্তায় ছেদ পড়লো পাশে বসা তাওহীদ এর কথায়। ও বললো,
আংকেল একটা গাড়ি নিয়ে নেন।
হ্যা নিবো, সময় হলে।
আচ্ছা তোমরা ক'ভাই বোন তাওহীদ ?
আমরা দুভাই
তোমাদের বাবা?
বাবা আছেন
কি করেন?
কিছু করেন না
মানে?
আব্বার অসুখ
কি অসুখ?
আব্বার "ব্রেইনে ধরা"
মানে?
"মানে আব্বা কিছু বুঝেন না। খালি ঘুরাঘুরি করেন, চিল্লাপাল্লা করেন। মাঝেমধ্যে উধাও হয়ে যান। কবরে কবরে লাল পাগড়ি মাথায় দিয়ে ঘুরেন। ঘরে এসে আবার কখনো কখনো আমাদের মারেন, আম্মাকে ও মারেন। আবার কখনো কখনো পুরো পুরি ভালো হয়ে যান। কাজ কাম করার চেষ্টা করেন। মানে কোন কিছুর ই ঠিক নাই"।
চিকিৎসা করিয়েছো?
হুম, চিকিৎসা করলে কিছুদিন ভালো থাকেন। পরে আবার যেই সেই। সবাই বলে আব্বা নাকি "পীরাকি" পাইছেন।
নামাজ পড়েন?
নাহ। নামাজ মনে চাইলে পড়েন, একসাথে শত শত রাকাত আবার কখনো একদম পড়েন না, রোজাও রাখেন না।
তাইলে পীরাকি কিসের?
"হুম আংকেল আমিও তাই বলি। আসলে এগুলো মানুষ বলে। ওরাতো অশিক্ষিত কিছু বুঝেনা। ওরাতো আর ব্রেইনের ও ডাক্তার না। তাই পীরাকি বলে। মাঝেমধ্যে এসে পানি পড়া টড়া নেয়"।
তোমার বাবার যে রোগ ঐটার নাম কি জানো?
জ্বী, "ব্রেইন ধরা" আংকেল?
না। ব্রেইন ধরা না। মুড ডিজওর্ডার"। বুঝছো?
জ্বী আংকেল।
কি বললাম, বলতো?
"মুড ডিজওর্ডার"।
হা। এখন থেকে কেউ বললে তাই বলবা।
ও মাথা নাড়ায়।
আচ্ছা এগুলো যে পীরাকি না ব্রেইনের রোগ, এটা তুমি কিভাবে বুঝলে?
আমার মামা বলছে।
তোমার মামা ডাক্তার?
"না। আমার মামা সিলেট স্টেডিয়ামে একজন ডাক্তারের চেম্বারে কাজ করেন। উনি একজন ডাক্তারের সাথে আলাপ করেছিলেন"।
তা ওষুধে যদি ভালো হয়ে যান, তাহলে ওষুধ খাওয়াও না কেনো?
আংকেল ওষুধের অনেক দাম। আমাদের টাকা পয়সা তেমন নাই।
কিন্তু ব্রেইনের রোগের ওষুধ তো বিনামূল্য পাওয়া যায়।
তাই নাকি আংকেল!!
হ্যা। তুমি এক কাজ করবা। তোমার বাবাকে নিয়ে একবার সিলেট মেডিকেলে যাবা। মানসিক রোগ বিভাগে যাবা। আমার কথা বলবা। এই নাও আমার কার্ড। এইটা দেখাবা। এক মাসের ওষুধ তোমাকে ফ্রী দিবে।
সত্যি!!?
হ্যা সত্যি।
লাগলে আজীবন দিবে তোমাদের।
সত্যি!!?
"হ্যা। এখন সব সরকারী হাসপাতালে ব্রেইনের রোগের ওষুধ ফ্রী তে পাওয়া যায়"।
আমি দেখলাম খুশিতে তার চোখে জ্বল চলে আসছে।
আমি অন্যদিকে তার মন ডাইভার্ট করলাম।
তোমাদের কোরান হিফজ করার নিয়ম টা কি রকম, আমাকে বলবে।
হ্যা। আমরা সবাই এক সাথে হিফজ করি। এক আয়াত দুই আয়াত। আংকেল আয়াত বুঝেন?
হ্যা বুঝি। বলো, তারপর।
খুব ভোরে উঠি আমরা। ফজরের আগে। প্রথমে সবাই তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ি। পরে ফজরের নামাজ পড়ে মুখস্থ করতে বসি। সকাল ৭ টা পর্যন্ত পড়া চলতে থাকে। এর পর নাস্তা খাই।"খাইয়া ঘুম"।
খাইয়া ঘুম?
জ্বি
তারপর?
তারপর নয়টায় উঠি। গোসল করে ক্লাসে যাই। যোহর পর্যন্ত মুখস্থ করি। যোহরের নামাজ পড়ি। তারপর সবাই দুপুরের খাবার খাই। "খাইয়া ঘুম"।
খাইয়া ঘুম?
জ্বি
তার পর?
তারপর উঠে আবার সবাই পড়তে বসি। আছরের নামজ পর্যন্ত পড়ি।
তারপর?
তারপর সবাই খেলতে যাই।
সবাই?
হ্যা সবাই। সবাই কে যেতে হয়।
কি খেলো?
ক্রিকেট, ফুটবল
তুমি কোনটা খেলো?
আমি ক্রিকেট
বোলার না ব্যাটসম্যান?
ব্যাটসম্যান
তাই?
জ্বি। ওপেনার।
আগে থেকেই খেলতে?
না, মাদ্রাসায় গিয়ে শিখছি।
তোমার প্রিয় খেলোয়াড় কে।
সাকিব
তাই?
প্রিয় টিম কোন দেশের। ভারত না পাকিস্থান?
প্রিয় টিম বাংলাদেশ। পরে অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলীয়া কেন?
এমনি।
গুড। চিমটি চিমটি।আমার প্রিয় টিম ও অস্ট্রেলিয়া। হা হা হা..
সেও হাসলো।
আচ্ছা খেলার পর কি করো?
একটু নাস্তা করি। মাগরিবের নামাজ পড়ি।
তারপর?
তারপর মুখস্থ করতে বসি।
কটা পর্যন্ত?
রাত নটা পর্যন্ত।
এশার নামাজ?
হ্যা। নটার সময় এশার নামাজ পড়ি সবাই একসাথে ।
তারপর?
তারপর রাতের খাবার খাই সবাই ।
তারপর?
দশটার আগে খাওয়া শেষ। "খাইয়া ঘুম"।
একেবারে ঘুম?
জ্বি আংকেল। ঘুম।
তারপর?
তারপর আবার তিনটায় উঠি। উঠে তাহাজ্জুদ, ফজর। এভাবেই তিন বছর।
বাইরের গল্পের বই টই পড়। এই যেমন নজরুল এর বই।
না আংকেল। তবে ইসলামিক বই পড়ি। সাধারণ ইসলামিক নিয়ম কানুনের বই। সপ্তাহে শুক্রবার ছুটির দিনে পড়তে হয় আমাদের। ছোট একটা লাইব্রেরী আছে আমাদের।
ঈদের জন্যে কি কিনেছো?
কিছু না।
কিনবা?
জানিনা, মনে হয় এবার কেনা হবেনা।
কেনো?
ঐ যে দেখেন না। বন্যার পানিতে সব তলিয়ে গেছে। মা আর বড় ভাই অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করে সংসার চালান। এবার বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে সব শেষ। খেতেও হয়তো পারবো না।
বাসের জানালা দিয়ে দেখলাম, মাইলের পর মাইল ফসলী জমি বানের পানিতে ভেসে গেছে। অকাল বন্যা। অথচ এসময় বৃষ্টি বা নেমে আসা পাহাড়ি ঢল না হলে এবার বাম্পার ফলন হতো।
আচ্ছা হিফজ পড়তে গেলে কেনো?
"আম্মা বলছেন। হিফজ করতে পারলে মক্তবে ইমামতি পেয়ে যাবো। তাছাড়া প্রতি বছর রোজা মাসে মসজিদে মসজিদে হাফেজ নেওয়া হয়। সেখান থেকেও যারা হাফেজ হন তাদের অনেক উপকার হয়। অনেক সম্মান হয়। আমার দু খালাতো ভাই আছেন। তারাও হাফেজ। তাদের অনেক সম্মান। আম্মা বলেছেন ভালো করে হিফজ করলে দুনিয়াতে ও ভালো আখিরাতেও ভালো"।
তোমার আম্মা ঠিক বলেছেন। আমার পেশাটাও তোমার মতো। ঠিক মতো করতে পারলে দুনিয়াতে ভালো আখেরাতেও ভালো।
ও আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসে।
হঠাৎ হেলপারের ডাকে খেয়াল হলো। আমার নামার সময় হয়েছে।
তাওহীদ আমি নামবো। তুমিতো পরের স্টপেজে নামবা?
জ্বি আংকেল।
আচ্ছা আমি তোমার ভাড়াটা দিয়ে দেই।
না আংকেল। লাগবেনা।
না দিই। তুমি না হয় হাফেজ হয়ে একদিন আমাকে শোধ করে দিও। শোন হাসপাতালে আমার কাছে তোমার ভাইকে নিয়ে আসবা একদিন। আর যদি সিলেট এ তোমার বাবাকে নিতে না পারো তবে আমার হাসপাতালে উনাকে নিয়ে আসবা। আমার হাসপাতালেও ফ্রীতে "ব্রেইনে ধরার" ওষুধ পাওয়া যাবে। তোমার বাবা সম্পুর্ন সুস্থ হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ। কার্ডে ফোন নাম্বার ও ঠিকানা দেয়া আছে। যোগাযোগ করবা। ওকে?
ও মাথা নেড়ে হ্যা বললো।
ছোট করে সালাম দিলো, আসসালামু আলাইকুম।
লেখক: ডা. সাঈদ এনাম । এম.বি.বি.এস (ডি এম সি) এম ফিল (সাইকিয়াট্রি) সাইকিয়াট্রিস্ট ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা।
