সুন্দরী কুলাউড়া

সুন্দরী কুলাউড়া - সুশীল সেনগুপ্ত
সুশীল  সেনগুপ্ত: মৌলভীবাজার জেলার শতাব্দীর প্রাচীন শহর কুলাউড়া। রেল ও সড়ক যোগাযোগ থাকায় এই শহরের কর্মচাঞ্চল্য ক্রমেই বেড়ে চলছে। এই শহরটি অনেক জ্ঞানী গুণী প্রথিতযশা মণিষীর পাদষ্পর্শে ধন্য এককালের সুন্দরী কুলাউড়া। রাজনৈতিক সচেতন এই শহরের মানুষ ধন্য হয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি, হোসেন শহীদ সোরওয়ার্দী, মহাত্মা গান্ধী, সংবাদপত্র জগতের দিকপাল তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াসহ বরেণ্য ব্যক্তিদের উষ্ণ আলিঙ্গনে। আজ ও অতীতের গৌরবময় স্মৃতি চিহ্ন ধারন করে আছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়, পরতে পরতে।
কুলাউড়ার নামকরণের নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য সূত্র পাওয়া গেছে বলে আমার জানা নেই। এখানে এই প্রসংগের অবতারনা অবান্তর। নামাকরণ আমার এই লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। শাপদ সংকুল বন-বনানী ঘেরা, প্রকৃতির লিলা নিকেতন এক কালের সুন্দরী কুলাউড়ার আজ বিবর্ণ চেহারা কেন? যা আজ প্রবীণদের মনকে প্রতিনিয়ত ভারাক্রান্ত করছে। শহরটি আজ গিঞ্জি শহরে পরিণত হয়েছে। রাস্তার দু’পাশ জুড়ে রয়েছে টং দোকানের পসরা; সেই সংগে যুক্ত হয়েছে যানবাহন। এক সময় রিক্সা নিয়ে পথচারিরা বিব্রত ছিল, এখন সেই স্থানটি দখল করেছে যান্ত্রিক বাহন সিএনজি, বিদ্যুৎ চালিত রিক্সা ও টমটম। এক বেসরকারি জরিপ থেকে জানা গেছে, শহর কেন্দ্রিক প্রতিদিন ৮ হাজেরের বেশি যান্ত্রিক বাহন এই শহরে বুক চিড়ে চলাচল করে। এই সকল যান্ত্রিক যানবাহনের জন্য কোন নির্ধারিত স্ট্যান্ড নেই। সমিতি নাম দিয়ে সঙ্গবদ্ধ হয়ে এরা রাস্তার পাশে টেবিল চেয়ার মেলে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে শুধু পথচারীই নয় স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদেরকে চলাচলে দারুন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এই শহরের যানজট নিরসন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে উপজেলা নিকট অতীতে একাধিক সভার আয়োজন করে ঘণ্টা দুই সময় নষ্ট করে দায়িত্ব শেষ করছেন কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। পরন্ত সভা সমাবেশ মানববন্ধনের সংখ্যা যত বাড়ছে সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলছে যানবাহন ও টং দোকানের সংখ্যা। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য এই সকল যানবাহনের চালকদের অধিকাংশরই নেই বৈধ লাইসেন্স। তা ছাড়া এই সকল যানবাহনের চালকদের গাড়ি চালনোর ব্যাপারে কোন প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা নেই। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা এই শহরের নিত্য দিনের ঘটনা। রাস্তার কালো পিচ লাল হচ্ছে, রক্ত চাক বাঁধছে, দু-একটি প্রতিবাদের ঝড় উঠে, মানববন্ধন হয়। তারপর ক্রমেই কালোপিচের বুক থেকে রক্তের লাল চিহ্ন বিলীন হয়ে যায়, আস্তে আস্তে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে। নতুন নতুন কোন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এখানে বদলি হয়ে এলে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে রাস্তার দুপাশ থেকে থেকে টং দোকান, অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়, সাময়িকভাবে সুন্দরী কুলাউড়া ফিরে পায় তার হারানো ঐতিহ্য, তাও বেশিদিনের জন্য নয়। দুষ্ট লোকের মন্তব্য বিশেষ কারণে সেই সকল কর্মকর্তারা চোখ বুজে ফেলেন। যারা এদের উপর নজরদারী রাখার কথা ক্রমেই বিষয়টি তাদের কাছে গাসহা হয়ে যায়। ফলে গভীর রাতে যে রাস্তার প্রস্থ থাকে ৭২ ফুট দিনের বেলা তা হয়ে যায় ৪২ ফুট।
আসুন আমরা সবাই মিলে এই শহরের হারানো সৌন্দর্যকে ফিরিয়ে আনতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাই। সুন্দরী কুলাউড়ার অতীতের স্মৃতিটুকু ফিরিয়ে আনতে সকলের মনে শুভবুদ্ধির উদয় হোক এ প্রত্যাশা রইল।
-- সুশীল সেনগুপ্ত: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Post a Comment

Previous Post Next Post