![]() |
| হাকালুকি হাওর তীরের জেলে ও দারিদ্রপীড়িত মানুষের মানবেতর জীবনযাপন |
নিউজ ডেস্কঃ এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি। এই হাওর তীরবর্তী দারিদ্রপীড়িত কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়ের দুঃখগাথা জীবন। প্রতিনিয়ত প্রতিকূলতার ভিতর সংগ্রাম করে তাদের বেঁচে থাকতে হয়। তাদের জীবন-জীবিকাও হুমকির সম্মুখীন। প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হয় সেখানে মানবাধিকার। একই ঘরে বাস করেন একাধিক পরিবার। নেই পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও সুপেয় পানীয় জলের সুবিধা। এই অমানবিক বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই! এসব অতিদরিদ্র কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়ের অভাব অনটনকে পুঁজি করে কিছু এনজিও হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। হাকালুকি হাওর তীরে জেলে পরিবারের মধ্যে ‘বিকল্প জীবিকায়ন প্রকল্প’র নামে প্রচেষ্টা নামক একটি বেসরকারি এনজিও সংস্থা মার্চ ২০১৩ থেকে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলা এবং সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলা এলাকায় তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত তাদের এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইল ইউনিয়নের জেলে পাড়া অধ্যুষিত ৯নং সাদিপুর ওয়ার্ডে ৩০ জন ও ৪০ জনের ৬টি সমিতি করে এনজিওটি কাজ শুরু করে। এছাড়াও বরমচাল ইউনিয়ন ও ভাটেরা ইউনিয়নে তাদের কর্ম এলাকা রয়েছে। ইতোমধ্যে ভাটেরা এলাকায় তাদের প্রজেক্টের কাজ শেষ হয়েছে মর্মে চেয়ারম্যানের কাছ থেকে চিঠি নিয়ে গেছে এনজিওটি। সংস্থাটি এ পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম প্রায় শতভাগ সম্পূর্ণ ও সফল দাবি করলেও বাস্তবে পাওয়া যায় ভিন্ন চিত্র। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় ১২শ পরিবার এবং সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জের শরীফগঞ্জ ও উত্তর বাদেপাাশা গ্রামে ৮শ পরিবারের মধ্যে তাদের কর্মপরিধি থাকলেও বাস্তবে কতজন লোক উপকৃত হয়েছে তা দেখার বিষয়। এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওর মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলা জুড়ে বিস্মৃত। হাওর তীরের এই ৫ উপজেলার ২ লক্ষাধিক মানুষ জীবন-জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই হাওরের উপর নির্ভরশীল। হাওর তীরের মানুষ অতিমাত্রায় হাওরের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় হাওরের উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ে হাওর তীরের মানুষের জীবন-জীবিকা। অকাল বন্যা আর দীর্ঘ খরায় প্রতি বছরই ক্ষেতের ফসল হারিয়ে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ফলে সরকার ১৯৯৯ সালে হাকালুকি হাওরসহ দেশের ৮টি এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া-ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে। সরেজমিনে কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইল ইউনিয়নের মীরশংকর-সাদিপুর, বাদে ভূকশিমইল, বরমচার ইউনিয়নের আকিলপুর ও ভাটেরা ইউনিয়ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এখানকার জীবনমান উন্নয়নতো দূরের কথা অর্থাহারে অনাহারে মানবেতর দিনযাপন করে যাচ্ছেন দরিদ্রপীড়িত জনসাধারণ। জেলে পাড়া অধ্যুষিত সাদিপুরের মৎস্যজীবিরা জানায়, বছরের ৩-৪ মাস হাওরে মৎস্য আহরণ করলেও ৮-৯ মাস তাদের বেকার সময় পার করতে হয়। মৎস্যজীবি মমতা বেগম, আলাতুন বেগম, মিনাজ মিয়া, সানাউল্লা, ছমির মিয়া, অকিল মিয়া, তসিম মিয়া, লেবু মিয়া জানান, বছর দু’য়েক আগে প্রচেষ্টা এই এলাকায় তাদেরকে নিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য সমিতি গঠন করে। এসব সমিতির মাধ্যমে সমিতির সদস্যদের বিনা সুদে ঋণ, বিনামূল্যে ধানের বীজ, বিশুদ্ধ পানির জন্য নলকূপ স্থাপন, হাঁস মোরগ পালন, মৎস্য চাষ, সবজি চাষের জন্য সহায়তা এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারী লেট্রিন, মহিলাদের ধাত্রী প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। কিন্তু তা করা হয়নি। তারা অভিযোগের সুরে আরো বলেন, সমিতি গঠনের পর তাদেরকে নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণের জন্য মিটিং ডেকে কর্মকর্তারা সহায়তার আশ্বাস ছাড়া কার্যত আর কিছুই দিতে পরেননি। এমনকি তাদের ছবি ও আইডি কার্ডও বিভিন্ন সময় নিয়েছেন। অনেক সময় মাঠ কর্মীরা সভা করতে গিয়ে ডান হাতে-বাম হাতে দস্তখত নেয়ার কথাও বলেন। সমিতি গুলোর সভাপতি-সম্পাদকরা অভিযোগ করে বলেন, এ পর্যন্ত তাদের সমিতিগুলোর মধ্যে তিন জন করে সদস্যদের বিনা সুদে ৫ হাজার টাকা করে ঋণ দেয়া হয়েছে। যার বেশিরভাগ ইতিমধ্যে তারা পরিশোধ করেছেন। অনেকেই বলেন এ ঋণ নিয়ে তাদের কোনও কাজে আসেনি বরং ক্ষতি হয়েছে। ৬টি সমিতির মধ্যে মাত্র ১২টি পায়খানা বিতরণ করা হয়েছে এবং কিছু কিছু ধানবীজ দেয়া হয়েছে। এলাকায় প্রতিটি ঘরে খোলা পায়খানা চোখে পড়ে। বিশুদ্ধ পানির প্রচুর সংকট থাকলেও দেয়া হয়নি কোনও টিউবওয়েল। আগে থেকে যেগুলো আছে তাও নষ্ট। বরমচাল ইউনিয়নের আকিলপুর গ্রামের জোছনা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তাঁর ঘর-দোয়ার ভাঙা, খোলা পায়খানা অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। স্বামী রশীদ আলী এখনো পাহাড় থেকে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। অথচ জোছনা বেগমকে অক্সফাম জার্নালে বিশ্বের ১০ জন কৃষাণী নারীর মধ্যে ৩ নম্বরে স্থান দিয়েছে বলে জানা যায়। এলাকার মুরব্বী হাজী ঈসমাইল খান বলেন, রশীদ আলী এখনো কাঠ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে অথচ এনজিওরা কিভাবে এদের স্বাবলম্বী বলে তা আমাদের বোধগম্য নয়। বাড়িতে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে শুধু একটি টিউবওয়েল স্থাপন করেছে। জোছনা বেগমের স্বামী রশীদ আলী বলেন, তাঁর স্ত্রী বছর-দেড় বছর থেকে এনজিও’র সাথে জড়িত হয়েছেন। এর আগে তাঁর স্ত্রী বাড়ির কাজসহ তাঁর সাথে কৃষিকাজ করতো। তাঁর স্ত্রীকে এনজিও সংস্থা কেন বেছে নিল তা তিনি জানেন না বলেও জানান। এ সময় তাঁর স্ত্রীকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। রশীদ আলী জানান তার স্ত্রী জোসনা বেগম মিটিং করতে ঢাকায় চলে গেছেন। ভূকশিমইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রেনু বলেন, প্রচেষ্টা আসলে কোনও কাজই করেনি। শুধু ইউনিয়নে এসে বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যথাযথ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন মানুষের মাথাগুনে এনজিওরা যে টাকাটা আনে তা যেন তাদের কাজে লাগে। তিনি আরও জানান, এ ব্যাপারে তিনি উপজেলা প্রশাসনের সভায় জোরালো বক্তব্যও রেখেছেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এর কোনও প্রতিকার হচ্ছে না। ভাটেরা ইউনয়ন পরিষদের চেয়াম্যান মোঃ সিরাজ মিয়া বলেন, প্রচেষ্টার কার্যক্রম নিয়ে আমার কাছে ধুম্রজালের সৃষ্টি হওয়াতে আমি এলাকায় কর্মরত প্রচেষ্টার লোকদের সাথে অনেক তর্কাতর্কি করেছি কিন্তু তারা আমাকে কোনও সদুত্তর দিতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, আমার এলাকায় তাদের সমিতি থাকলেও কোনও কর্মকান্ড আমার চোখে পড়েনি বা কোনও কাজ তারা করেনি। তিনি বলেন, গত বৎসরের ডিসেম্বর মাসে বা এই বৎসরের জানুয়ারি মাসে তাদের কর্মকান্ড শেষ হয়েছে বলে তাঁর কাছ থেকে দস্তখত নেয়া হয়েছে। অনেকটা জোর করেই তাঁর কাছ থেকে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মানুষের জন্য আসা টাকা যেন সঠিক কাজে ব্যয় করা হয় এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন। প্রচেষ্টার ‘হাকালুকি লাইভহুডস ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট (এইচএলডিপি) এর প্রজেক্ট ম্যানেজার মোঃ ফেরদৌস আলম বলেন, হাকালুকি হাওর তীরের মানুষদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কুলাউড়া উপজেলায় ভূকশিমইল বরমচাল ভাটের ইউনিয়নে হংকংয়ের অক্সফামের অর্থায়নে ২০১৩ সালের মার্চ মাস থেকে ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত ‘বিকল্প জীবিকায়ন প্রকল্প’ নামে প্রচেষ্টা এসব এলাকায় ৩০টি সমিতির মাধ্যমে জেলে ও কৃষক পরিবারের ১২০০ নারী-পুরুষ নিয়ে সংস্থাটি তাদের কার্যক্রম শুরু করে। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত তারা ৭০ শতাংশ কাজ সমাধা করেছেন। তাদের প্রজেক্টের মধ্যে ৬৬ রকমের কাজ রয়েছে। তবে তিনি শুধু জানান সুদবিহীন ঋণ দিয়েছেন ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, হাঁস-মুরগী পালন বাবত ২৫ জনের মধ্যে ১ লক্ষ টাকা, মৎস্য পালনে ২ লক্ষ টাকা, ৫০টি পরিবারকে ২ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ২০১৪ সালে ৫টি টিউবওয়েল এবং ২০১৫ সালে ২টি টিউবওয়েল দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে উপকারভোগীদের মধ্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য কর্ম পরিধির কথা তিনি বলতে পারেননি। প্রচেষ্টার নির্বাহী পরিচালক নবাব আলী নকী খান বলেন, আমাদের প্রজেক্টের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। দু’একটি জায়গায় সামান্য ত্রুটি থাকতে পারে। আমরা সবসময় সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে থাকি। পরিবেশ অধিদপ্তর কুলাউড়া ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অফিসার বশির আহমদ জানান, প্রচেষ্টা তাদের সাথে যৌথভাবে যে কাজটি করেছে তা ভাল করেছে। তবে অক্সফাম কর্তৃক প্রজেক্টের সাথে আমাদের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তাদের কাজ সম্পর্ক কতটুকু সফল তা তিনি বলতে পারছেন না। তিনি আরও জানান, কোনও এনজিও সংস্থাই শতভাগ কাজ করতে পারে না। এ ব্যাপারে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
