নিউজ ডেস্কঃ ‘সবার আগে বাংলাদেশ’— রাষ্ট্র পরিচালনার এই মূলনীতিকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে বিএনপি। এতে দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয় দিন আগে অর্থাৎ শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ইশতেহার ঘোষণা করবেন। দলটির মিডিয়া সেল জানিয়েছে, বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠানটি শুরু হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সঞ্চালনা করবেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
ইশতেহারের মূল ভিত্তি
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ইশতেহারটি তৈরি করা হয়েছে বিএনপিঘোষিত ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’, প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ‘১৯ দফা’, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সমন্বয়ে।
প্রধান আকর্ষণ ও প্রতিশ্রুতি
এবারের ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও পররাষ্ট্র নীতি, প্রতিরক্ষা খাত, পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার ও আওয়ামী লীগ আমলের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তদন্তকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এছাড়া খতিব-ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানীর মতো জনমুখী ইস্যুগুলোও থাকছে। নারী ও তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সমন্বয়ে ইশতেহারের বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করা হয়েছে।
ইশতেহারে উল্লেখ থাকছে ১৯৭১ সালের ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ১৯৭৫ সালের ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’, ১৯৯০ সালে ছাত্রদের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ বিষয়গুলো।
ইশতেহারে যেসব বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—
সবার জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা
স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এ খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। প্রতিটি নাগরিকের বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রবর্তন করা হবে ‘ই-হেলথ কার্ড’। এছাড়া দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী— মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য এবং প্রাণঘাতী ও জটিল রোগের আধুনিক চিকিৎসায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেল গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তরুণ ও যুবসমাজের উন্নয়ন পরিকল্পনা
তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বিএনপির ইশতেহারে থাকছে একগুচ্ছ আধুনিক পরিকল্পনা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— আইটি পার্কে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অফিসের সুবিধা প্রদান, দেশজুড়ে ফ্রি ওয়াইফাই জোন সৃষ্টি এবং আউটসোর্সিং ও ক্ষুদ্র-মাঝারি (SME) শিল্পের বিকাশে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা। আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম অ্যামাজন ও আলিবাবার সঙ্গে দেশের বাজারকে সংযুক্ত করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকছে এতে।
এছাড়া তরুণদের বিশ্ববাজারের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ‘স্টার্ট-আপ ফান্ড’ গঠনে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় বড় সংস্কারের অংশ হিসেবে মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি নিশ্চিত করতে ‘জব ম্যাচিং’ সেবা চালুর অঙ্গীকারও থাকছে দলটির ইশতেহারে।
শিক্ষা খাতের আমূল পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন
শিক্ষা খাতের উন্নয়নে বিএনপি তাদের ইশতেহারে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে। পাঠ্যক্রমে আন্তর্জাতিক চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে ইংরেজি ও বাংলার পাশাপাশি তৃতীয় একটি বিদেশি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা থাকছে দলটির।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস প্রদান এবং প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শতভাগ সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করার কঠোর অঙ্গীকার করা হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীসহ ‘ভেন্ডিং মেশিন’ স্থাপনের যুগান্তকারী উদ্যোগ নেবে দলটি।
শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। ইশতেহারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো প্রবর্তনের পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিশেষ কল্যাণমূলক কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসার জোরালো অঙ্গীকার করা হয়েছে।
৫ বছরে এক কোটি জনশক্তি রপ্তানি
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা অনুযায়ী, দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে আগামী ৫ বছরে দক্ষ ও অদক্ষ মিলিয়ে মোট এক কোটি জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
৫ বছরের মধ্যে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ
পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিএনপির ইশতেহারে এক বিশাল সবুজ বিপ্লবের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশজুড়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ‘সবুজ কর্মসংস্থান’ সৃষ্টির এক বলিষ্ঠ অঙ্গীকার করা হয়েছে।
ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার রক্ষা
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানসহ বিগত স্বৈরাচারী আমলের সকল মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকছে। বিশেষ করে, যেসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনও শুরু হয়নি, সেগুলো অবিলম্বে শুরু করে দায়ীদের দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ায় আনা হবে। পাশাপাশি, গুমের মতো জঘন্য অপরাধ চিরতরে বন্ধ করতে এবং এর প্রতিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কঠোর আইন প্রণয়ন ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
জবাবদিহিতা নিশ্চিতে ‘উন্নয়ন জনসভা’
এবারের ইশতেহারের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ বা ‘চমক’ হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করার এক অভিনব পরিকল্পনা। এতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে যে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে প্রতি বছর অন্তত একবার উন্মুক্ত স্থানে ‘উন্নয়ন জনসভা’ আয়োজন করা হবে। যেখানে সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সরাসরি জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে এবং নাগরিকরা তাদের মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
৫ বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানো
শিল্পকারখানার বর্জ্য ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার থাকছে বিএনপির ইশতেহারে। সেখানে বলা হয়েছে, টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা হবে। পরিবেশ রক্ষায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি
দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুসংহত করতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (সবার আগে বাংলাদেশ) নীতিকে মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে বিএনপি। এই নীতির আলোকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত একটি সুশৃঙ্খল, যুগোপযোগী ও আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পাচ্ছে।
পুঁজিবাজারের সংস্কার ও বিনিয়োগ উন্নয়ন
বিগত ১৫ বছরে পুঁজিবাজারে ঘটে যাওয়া নানা অনিয়ম ও কারসাজিতে ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আস্থা ফেরাতে গত ১৫ বছরের সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্তে একটি ‘বিশেষ তদন্ত কমিশন’ গঠনের জোরালো প্রতিশ্রুতি থাকছে দলটির ইশতেহারে।
পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী করতে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এছাড়া তরুণ প্রজন্মকে পুঁজিবাজার সম্পর্কে সচেতন ও দক্ষ করে তুলতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেয়ারবাজার সংক্রান্ত শিক্ষার প্রসার ঘটানোর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে বিএনপি।
৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বিএনপির ইশতেহারে থাকছে বিশেষ মহাপরিকল্পনা। এতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, বর্ধিত চাহিদা মেটাতে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। জ্বালানি খাতের টেকসই উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন বিনিয়োগের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে দলটির পক্ষ থেকে।
তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান
দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রযুক্তি নির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এই খাতে অন্তত ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির এক বিশাল কর্মপরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি থাকছে।
রাইড শেয়ারিংয়ে ‘সাইকেল সেবা’ চালু
দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোয় বৈচিত্র্য আনতে গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি ইশতেহারে থাকছে আধুনিক কিছু উদ্যোগ। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, যানজট নিরসন ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রধান সড়কগুলোতে পৃথক লেন এবং জনপ্রিয় যাতায়াত মাধ্যম হিসেবে রাইড শেয়ারিংয়ে ‘সাইকেল সেবা’ চালুর বিশেষ অঙ্গীকার করতে যাচ্ছে বিএনপি।
রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা
দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করাতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে বিএনপি। দলটির লক্ষ্য হলো রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তারা ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে; যার মধ্যে স্বল্পমেয়াদে ২ শতাংশ এবং মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ইশতেহারে থাকছে।
পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার ও সুশাসন
বিগত দেড় দশকে দেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনা বিএনপির ইশতেহারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। দলটির পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনার জন্য সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের অর্থপাচার রোধে এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের রূপরেখা ইশতেহারে স্পষ্ট করা হয়েছে।
বেসরকারি কর্মীদের জন্য ‘পেনশন ফান্ড’ গঠন
বেসরকারি খাতে কর্মরত বিশাল জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুগান্তকারী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করছে বিএনপি। বেসরকারি খাতের কর্মীদের কর্মজীবন শেষে বার্ধক্যের দুর্দশা নিরসনে এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি ‘কার্যকর পেনশন ফান্ড’ গঠনের জোরালো প্রতিশ্রুতি থাকছে দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে।
‘জাল যার, জলা তার’ নীতি গ্রহণ
মৎস্যজীবী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিএনপির ইশতেহারে উপকূলীয় অঞ্চল ও হাওর এলাকার ইজারা প্রথা বাতিলের সাহসী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। এর পরিবর্তে ‘জাল যার, জলা তার’—এই নীতিকে মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হবে। এর ফলে মৎস্য আহরণের জন্য সকল জলাশয় প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, যাতে তারা কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর শোষণ ছাড়াই স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন
দেশের নৌপথ সচল এবং কৃষিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও নাব্য সংকট দূর করতে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন এবং দখলকৃত জলাশয় পুনরুদ্ধারের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করা হবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদা
‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’— বিএনপি চেয়ারম্যানের এই উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে ধর্মীয় নেতাদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, মসজিদের খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক সরকারি সম্মানী এবং ধর্মীয় উৎসবগুলোতে বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।
একইভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব উপাসনালয়ের প্রধানদের (পুরোহিত, ভান্তে, যাজক প্রমুখ) জন্য মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতার ব্যবস্থা করার অঙ্গীকার থাকছে। এছাড়া পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অধিকার রক্ষা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি পৃথক ‘নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর’ গঠন করা হবে।
নেতৃবৃন্দের বক্তব্য
ইশতেহারের বিষয়ে বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ আলমগীর পাভেল বলেন, “আমরা বরাবরই বলছি যে, দেশ গড়ার পরিকল্পনাই হচ্ছে বিএনপির ইশতেহারের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সামাজিক উন্নয়ন, আমাদের সক্ষমতা এবং আদর্শিক অবস্থানকে বিবেচনায় রেখেই এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে সাধারণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক সব পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের মর্যাদা, স্বীকৃতি ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রবর্তন করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষক কার্ড হবে পুরোপুরি কৃষিবান্ধব। এর মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। পণ্যের বীমা সুবিধা, সার-বীজ প্রদান এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি থাকছে এতে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে আমরা কেবল মৌখিক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ নই; স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আইসিটি খাতে প্রণোদনা দিয়ে আমরা বড় ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হলো আগামী ১৮ মাসে সরকারি-বেসরকারি পর্যায় এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (PPP) মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।’
ধর্মীয় ও পরিবেশগত বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মসজিদের খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য ধর্মের পুরোহিত ও ধর্মযাজকদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় এনে বিশেষ প্রণোদনা ও স্বীকৃতি দেওয়া হবে। পরিবেশ রক্ষায় আমরা পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করেছি, যা আমাদের জ্বালানি খাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে, সবচেয়ে বড় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দুর্নীতি নির্মূলে। সরকারি ক্রয় খাতসহ সব ক্ষেত্রে ব্যক্তির হস্তক্ষেপ কমিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। আমরা আকাশকুসুম কোনো পরিকল্পনা নয়, বরং ছোট ছোট প্রকল্পের মাধ্যমে বড় দুর্নীতি রোধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বাক-স্বাধীনতা এবং সর্বস্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চাই। এটাই আমাদের ইশতেহারের মূল কথা।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাক-স্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলো বিএনপির ইশতেহারে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার ও আধুনিকায়ন
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, “স্বাস্থ্য খাতে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি রোধ করা। এই দুর্নীতির কারণে বর্তমানে বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হচ্ছে। আমরা স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছি; কিন্তু এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ যদি দুর্নীতির কারণে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। আমাদের দলের চেয়ারম্যান দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা মনে করি, এই নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন করা গেলে স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন, ‘দলীয় নীতি অনুযায়ী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা একেবারে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে। এতে রোগ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার (প্রিভেনটিভ হেলথ কেয়ার) ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে, যেন শুরুতেই রোগ ঠেকানো যায় এবং পরবর্তী সময়ে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কমে আসে।’
চিকিৎসাসেবা ডিজিটালাইজ করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে ডা. রফিক বলেন, ‘একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরি করা হবে, যেখানে একজন রোগীর সবধরনের রোগ-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে চিকিৎসক সহজেই রোগীর পূর্ব ইতিহাস জানতে পারবেন এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কার্যকর হবে।’
এছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি ‘স্বাস্থ্য পর্যটন সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বিশ্বমানের চিকিৎসা দেশেই নিশ্চিত করা যায়— উল্লেখ করেন ডা. রফিকুল ইসলাম। সুত্রঃ ঢাকা পোস্ট
