ফজলুল বারী: প্রতারনামূলক মুজিব কোট পরে ধানের শীষের পক্ষে ভোটে নেমেছেন সাবেক আওয়ামী লীগার সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ! মনোনয়ন পত্র দাখিলের পর দেয়া বক্তৃতায় তিনি তার রাজনৈতিক ডিগবাজির পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বলেছেন দেশে কোন স্বাধীনতা বিরোধী নেই। সুলতান মনসুরের হাতে তৈরি রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা তার বক্তৃতার লিঙ্ক পাঠিয়ে বিষয়টি নিয়ে লেখার জন্য অনুরোধ করেছেন। বক্তৃতার ভিডিও লিঙ্কটি শুনে মন থেকে প্রথম যে শব্দটি বেরোয় তাহলো বেঈমান। কারন সুলতান মনসুর জানেন আমি তাকে কতোটা চিনিজানি। তিনিও আমাকে চেনেন জানেন। তার নির্বাচনী এলাকায় কুলাউড়ায় আমার বাড়ি। সাংবাদিকতার শুরুর দিকে এরশাদ আমলে ঢাকায় খুব কাছে থেকে আমরা পরষ্পর পরষ্পরকে চিনেছি জেনেছি। কাজেই তার রাজনৈতিক ডিগবাজি নিয়ে আমার লেখা খুব স্বাভাবিক একটু বেশি কড়া হবে। বেঈমান শব্দটা তার মুখে অনেক শুনেছি। নানা ইস্যুতে অমুক অমুককে উদ্দেশ্য করে বলতেন ‘ইগু বেঈমানবা’। আজ এই বিশেষনটি তাকেই আমি ফেরত দিলাম। বেঈমান সুলতান মনসুর।

তার বয়সী একজন মানুষ যিনি মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ছাত্রত্ব শেষ করেছেন, তাকে আবার ছাত্র বানিয়ে সমসাময়িক অনেক ছাত্রলীগ নেতাকে বঞ্চিত করে ডাকসুর ভিপি করেছিলেন শেখ হাসিনা। ছাত্র সেজে থাকতে তখনই নিয়মিত তখন চুলে কলপ গোঁফে কলপ লাগাতেন। সংলাপের সময় জানলাম শেখ হাসিনা তাকে বলছেন তিনি মাঝে একবার আব্দুর রাজ্জাকের বাকশালেও চলে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পরও শেখ হাসিনা তাকে আবার জায়গা দিয়েছেন, ডাকসু ভিপি বানিয়েছেন, এরজন্যেইতো তার তকমা এখনও সাবেক ডাকসু ভিপি! শুধু তাকে সেখানেই থামিয়ে রাখেননি শেখ হাসিনা। নৌকার টিকেট দিয়ে তাকে এমপি করেছিলেন। আর এর প্রতিদান দিতে ১/১১’র সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রথম বেঈমানি করেন সুলতান মনসুর। শেখ হাসিনার দূর্ভাগ্য এমনই। যখন যাকে ধারন ক্ষমতার চাইতে বেশি দিয়েছেন সেই তাঁর সঙ্গে বেঈমানি করেছে!

১/১১’র সামরিক লোকজনের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে শেখ হাসিনাকেই রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেবার খায়েশ দেখান! ওই সময়ে মতিউর রহমান চৌধুরী তাকে দিয়ে যে সব বলাচ্ছিলেন সে সব পড়ে শুনে আমি শুধু অবাক হয়ে ভেবেছি লোকটা বলদ নাকি! কারন মতিউর রহমান চৌধুরীর রাজনৈতিক আদ্যপান্ত যারা আমাকে বলেছেন তাদের অন্যতম এই সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ। তাকে তিনি আমাকে বলতেন বিএনপি-জামায়াতের পিওর লোক। আর সেই মতিউর রহমান চৌধুরী চাইবেন সুলতান মনসুর আওয়ামী লীগে থাকুন, এসব বলকয়ে কেউ আওয়ামী লীগে থাকতে পারে কিনা এটি তিনি যদি না বোঝেন তাহলে তিনিতো একজন রাজনৈতিক বলদ-আবাল ছাড়া কিছু নয়। কুলাউড়ার মনোনয়ন দাখিলের পর সুলতান মনসুর বলেছেন দশ বছর তিনি রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার হয়েছেন! তিনি একজন প্রকাশ্য বেঈমানের ভূমিকায় তার রাজনৈতিক অভিভাবক শেখ হাসিনার ধংস চেয়েছেন এরপরও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ সহ এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা কোথাও তার গায়ে কোন ফুলের আঁচড়ও দেয়নি, এখনও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুজিব কোট পরে তার মেয়ের ধংস চাচ্ছেন, এসবই কী তার জন্যে বড় পাওনা নয়?

সুলতান মনসুরের হাতে ধানের শীষ (সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ধানছড়া) তুলে দিয়ে কুলাউড়া বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকদেরও খুশি হবারও কারন নেই। কারন সুলতান তাদের ওখানে দুধের মাছি। ১/১১’র সময় সুলতান মনসুর শুধু শেখ হাসিনা না, খালেদা জিয়াকেও রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। কাজেই এখন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে তার আহাজারি একজন ডিগবাজি বিশারদ সুলতান মনসুরের মায়াকান্নার অভিনয় ছাড়া কিছু নয়। একজন বেঈমানের পরিচয় আগেও বেঈমান পরেও বেঈমান। ডিগবাজি বিশারদ বেঈমান কখনো রাজনীতিবিদ হিসাবে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেনা। সুলতান মনসুর ভাই’র, কোরবান আলীর কথা নিশ্চয় মনে আছে। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ছিলেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের তুমুল সময়ে একদিন তার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এক আড্ডায় বসে আছি। এমন সময় খবর এলো বঙ্গভবনে এরশাদের মন্ত্রী হিসাবে শপথ নিতে গেছেন কোরবান আলী। আওয়ামী লীগের এই প্রজন্ম কী সেই কোরবান আলীর নাম এখন জানে? না। বেঈমানের কথা কেউ মনে রাখেনা।

ব্যক্তি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদকে যতোটা জানি তার আসলে আওয়ামী লীগের মোড়কে পড়ে থাকার কথা ছিলোনা। তার পরিবারের বিরুদ্ধে সিলেট শহরে হিন্দু সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে। মনীষ ঘোষ নামের সেই সম্পদ হারানো ব্যক্তিটি পরে প্রানভয়ে সিলেট থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকা চলে আসেন। সেই পরিবারের এক সদস্য এখন ঢাকার এক টিভির জনপ্রিয় সাংবাদিক।

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ এমপি থাকতে তার কিছু লোকজন খাসিয়া আদিবাসীদের বেশকিছু জমি দখল করলো। ক্ষতিগ্রস্ত খসিয়ারা জানতো সুলতান ভাইর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো। প্রতিকারের বড় আশা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা জনকন্ঠ অফিসে আমার কাছে আসে। সুলতান ভাইকে ফোন করলে তার জবাব শুনে আমি তাজ্জব বনে যাই। তিনি আমাকে নির্লিপ্ত জবাব দিয়ে বলেন, খাসিয়া ভোট কয়টা? যেদিকে ভোট বেশি আমি সে পক্ষে। সুলতান মনসুর আওয়ামী লীগের এমপি। দেশের আদিবাসী-সংখ্যালঘুরা এ দলটিকে তাদের ভরসা-আশ্রয়স্থল ভাবেন। সেই দলের এমপি হয়ে যদি তিনি এমন কথা বলেন! কাজেই তার স্খলনে আমি অবাক হইনি। এমন লোক অন্তত আওয়ামী লীগের নেতা-এমপি থাকার লোক না। তিনি যেখানকার লোক সেখানেই চলে গেছেন।

রাজনৈতিক ডিগবাজির পরও এখনও শরমে অনেক দিনের অভ্যাস মুজিবকোট খুলতে পারেননি সুলতান মনসুর। অনেক দিনের মুখস্ত অভ্যাসে এখন কথায় কথায় বঙ্গবন্ধুর কথা বলেন! জয় বাংলা বলেন! বঙ্গবন্ধুর দোহাই, জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনার ধংস কামনা? এই লোক হাসানো চাতুর্য তার বন্ধ করা দরকার। কুলাউড়ায় মনোনয়পত্র জমা দেবার পর বলেছেন দেশে কোন স্বাধীনতা বিরোধী নেই, মাওলানা ভাসানীর ধানের শীষ, বিএনপির ধানের শীষ! সিলেটের জনসভায় বলেছেন, শহীদ জিয়া বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে একাত্তরের ২৭ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষনা করেন! বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস কি ২৭ মার্চ? দুর্নীতির মামলার বিচারে দন্ডিত খালেদা জিয়ার জন্যেও উফ-আহ করেছেন। নৌকা হারিয়ে ধানের শীষ হাতে নিয়ে ডিগবাজি বিশারদ হিসাবে তার এমন বক্তৃতাই দেবার কথা। কিন্তু আগে ঠিক উল্টো কথাবার্তায় যে সব নেতাকর্মীদের তিনি দীক্ষিত করেছিলেন তাদের কাছে এখন জবাব কী? কুলাউড়ার পথেঘাটে কিন্তু তাদেরকে তার ফেস করতেই হবে।

সুলতান ভাইকে বলছি, আপনি সজ্ঞানে রাজনীতি বদল করেছেন, এটি আপনার অধিকার। এখন ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন আগামীতে বিএনপিতেও যোগ দেবেন। কিন্তু প্রতারনামূলক ইতিহাস আওড়াবার কি দরকার? না আপনাকেও লন্ডনে পলাতক ইতিহাসবিদ তারেক রহমানের রোগে পেয়েছে? বিএনপির নজরুল ইসলাম খান বলেছেন জামায়াতেও মুক্তিযোদ্ধা আছে, আর আপনি বলেছেন বাংলাদেশে কোন স্বাধীনতা বিরোধী নেই! নজরুল ইসলাম খান যেটি বলেছেন, এটি তার চাকরি। আর আপনার এখন বোধ হতে পারে তারেকের দয়ায় ধানের শীষ পেয়েছেন! সেটাও হোক। কিন্তু প্রতারনামূলক মুজিবকোট পরে এসব ভন্ডামো কেনো? তারেকদের সাফারীতে আপনাকে খুব খারাপ মানাবেনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের মুজিবকোট পরে তার মেয়ে ধংসের নিয়তে থাকা একজন বেঈমানের গায়ে মুজিবকোট বেমানান-প্রতারনামূলক। এটি এখনি খুলুন। অথবা আপনার দীক্ষিত সাবেক নেতাকর্মীরাই কিন্তু যে কোন সময় পথেঘাটে তা খুলে নেবে। আপনি এই অপমানের মুখে পড়ুন সেটি চাইছিনা সুলতান ভাই।
লেখকঃ ফজলুল বারী, সিডনী প্রবাসী সাংবাদিক

Post a Comment

 
Top