বাস লঞ্চ ট্রেনে ঘরমুখী মানুষের স্রোত


অনলাইন ডেস্কঃ শুক্রবার ঈদযাত্রার প্রথমদিনই ঘরমুখী মানুষের ভিড় ছিল উল্লেখ করার মতো। বাস ও রেল স্টেশনগুলোতে ছিল না তিল ধারণের ঠাঁই। পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে মঙ্গলবার থেকে মানুষ ঢাকা ছাড়তে শুরু করলেও শুক্রবার স্টেশনে স্টেশনে ছিল যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়।

রাজধানীর কমলাপুর, বিমানবন্দর রেলস্টেশনসহ, মহাখালী, গাবতলী, সায়দাবাদ, শ্যামলী, কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড ও সদরঘাট লঞ্চঘাটে ঘরমুখী মানুষের যেন ছিল স্রোত। ঈদের আগের দিন মঙ্গলবার পর্যন্ত এই ভিড় থাকবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

শুক্রবার সকাল থেকেই পরিবার- পরিজন নিয়ে বাস, ট্রেন ও লঞ্চের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কাউকে কাউকে আবার টিকিটের খোঁজও করতে দেখা গেছে। লঞ্চ, বাস ও ট্রেনের ছাদে চড়েও যেতে দেখা গেছে যাত্রীদের।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশনে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতিটি ট্রেনই আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বিলম্বে ছাড়ছে। শুক্রবার ট্রেনের অগ্রিম টিকিট কাটা যাত্রীদের প্রথম যাত্রা ছিল। এ দিন মধ্যরাত পর্যন্ত ৩৩টি আন্তঃনগর ট্রেনসহ ৯৬টি যাত্রীবাহী ট্রেন কমলাপুর ছেড়ে যায়। প্রতিটি ট্রেনই অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যেতে দেখা যায়।

ট্রেনের ছাদ, ইঞ্জিন ও দরজায় ঝুলে যেতে দেখা যায় যাত্রীদের। অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করতে দেখা যায়নি। সূত্র বলছিল, যত সংখ্যক যাত্রীর টিকিট কেটে ট্রেনে ভ্রমণ করার কথা শুক্রবার থেকেই তার দ্বিগুণ যাত্রী ট্রেনে চড়ে বসেছে।

কথা হয় মহানগর প্রভাতি এক্সপ্রেসের যাত্রী শামসুল হকের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ভাই ১৯ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ৪টি টিকিট কেটেছিলাম। এবার যাত্রা করার পালা। ভালো লাগছে। একই ট্রেনের যাত্রী শামীম জানান, তারা ৫-৬ জন বন্ধু মিলে স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট কাটতে পারেননি। তাই বাধ্য হয়ে ট্রেনের ছাদে চড়ে বিনা টিকিটে গ্রামের পথে ছুটতে হচ্ছে।

কমলাপুর রেলস্টেশন ম্যানেজার সীতাংশু চক্রবর্ত্তী জানান, ঈদযাত্রার প্রথমদিন অধিকাংশ ট্রেনই সঠিক সময়ে কমলাপুর থেকে ছেড়ে গেছে। তবে একতা, দ্রুত যান ও সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ৪০ মিনিট থেকে সোয়া এক ঘণ্টা বিলম্বে ছেড়ে গেছে। ভিড়ের কারণে কিছু ট্রেন কিছুটা বিলম্বে ছাড়ছে। একেকটি ট্রেন স্টেশনে পৌঁছামাত্রই হুড়মুড় করে যাত্রী ট্রেনে উঠে পড়ছেন। ট্রেনটি পরিষ্কার করারও সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, যাত্রার দিন শুধু যাত্রীদের অনুরোধের ভিক্তিতে ১০-১৫ শতাংশ আসনবিহীন টিকিট বিক্রির সিদ্ধান্ত হলেও সবাই টিকিট কাটছেন না।

তিনি বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনা করে আমরা মাইকিং করছি যাতে কোনো অবস্থায়ই ট্রেনের ছাদে না ওঠেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা, ট্রেনের ছাদেও তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ঈদ উপলক্ষে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে প্রায় ৪৭ হাজার টিকিটধারী যাত্রী কমলাপুর ছাড়ছেন। কিন্তু এর বিপরীতে প্রায় ৮০-৯০ হাজার যাত্রী ট্রেনে ভ্রমণ করছেন। আসনবিহীন টিকিট কাটার একটা বিষয় থাকলেও ঈদের সময় অনেকেই বিনা টিকিটে ভ্রমণ করছেন।

ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াছিন ফারুকী জানান, ট্রেনের ছাদে ওঠা রোধ করা যাচ্ছে না। যাত্রীরা ট্রেনের ছাদ, ইঞ্জিনেও উঠে বসছেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

এক ট্রেনযাত্রী বলছিলেন, টিকিট নিয়ে ট্রেনে উঠতে পারলেও সিট পাইনি। ট্রেন স্টেশনে আসার পরপরই চলন্ত অবস্থায়ই অনেকে উঠে সিট দখল করে বসে যাচ্ছেন। এ নিয়ে রেল পুলিশের বক্তব্য- এত ভিড়ে আসলে কিছু করারও দেখছি না।

রাজধানীর বাসস্ট্যান্ডগুলোতেও ছিল ঘরমুখী মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। টিকিট পাওয়া, যানজট, গরম সব মিলিয়ে নানা ঝক্কি ও কষ্ট থাকলেও ঈদে বাড়ি যাওয়া নিয়ে অনেকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন।

অনেক যাত্রী বলছিলেন, ঈদের ছুটির সঙ্গে রবি ও সোমবারের বাড়তি ছুটি মিলিয়ে বেশ লম্বা ছুটিই পাওয়া গেছে এবার। রোজার ঈদে যেতে পারিনি। কিন্তু কোরবানির ঈদ গ্রামের বাড়িতে না করলে হয় না। আমরা খুবই আনন্দিত। সড়কের অবস্থা ভালো নেই, শতকষ্টেও বাড়ি যাচ্ছি। বাড়ি পৌঁছতেই সব কষ্ট শেষ হয়ে যাবে বলে জানান বাসযাত্রীদের অনেকে।

রংপুরের যাত্রী বিল্লাল হোসেন জানান, ৭ বন্ধু মিলে গ্রামে যাচ্ছি। রাস্তায় অনেক ঝামেলা হবে এটা স্বীকার করেই যাত্রা করেছি।

শ্যামলী পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক জীবন চক্রবর্তী জানান, উত্তরবঙ্গে এবার তেমন কষ্ট নেই। শুধু বঙ্গবন্ধু সেতুর পরে বগুড়া পর্যন্ত সড়ক খারাপ হওয়ায় ওই অংশে বাস ধীরগতিতে চলছে। অন্যদিকে দক্ষিণবঙ্গে ঘাটে প্রচণ্ড জট। স্রোত ও নাব্যতা সংকটে ফেরি চলাচলের সমস্যা হওয়ায় এ দুর্ভোগ।

এ ছাড়া আমিন বাজারে গরুর হাট বসায় দু-তিন ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে ঢাকায় ঢুকতে। একই কারণে ঢাকা থেকে বাসগুলো ছেড়ে হাট এলাকা পার হতে বেশ সময় লাগছে। সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ডে গিয়েও যাত্রীদের ভিড় দেখা গেল। একের পর এক বাস ছেড়ে যাচ্ছে।

বাস মালিক সমিতির সদস্য জয়নাল আবেদিন জানান, এবার আগে থেকেই বাসে করে যাত্রীরা ঘরমুখী হচ্ছেন। শুক্রবার যাত্রীদের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সামনে ভিড় বাড়বে। তিনি বলেন, যাত্রীরা ছাদে চড়ছেন। যাত্রীদের অনুরোধেই এমনটা করতে হচ্ছে।

ঢাকা-বগুড়া-নওগাঁ রুটে চলাচলকারী একতা পরিবহনের কাউন্টারের টিকিট বিক্রেতা আওয়াল জানান, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সব বাস সঠিক সময়েই গন্তব্যের উদ্দেশে টার্মিনাল ছেড়ে গেছে। যাত্রীরাও সময়মতো আসছেন। অন্যবারের চেয়ে এবার টার্মিনালে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভালো।

ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটে চলাচলকারী তিতাস পরিবহনের যাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী রোকেয়া আক্তার বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার বাস ছাড়বে। গ্রামে বাবা-মা অপেক্ষা করছেন। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার অনুভূতিই আলাদা। সময়মতোই বাস ছাড়বে বলে আশা করছি।

লঞ্চঘাটেও ঘরমুখো মানুষের ভিড় লক্ষ করা গেছে। সকাল থেকেই সদরঘাট থেকে লঞ্চগুলো সময় মেনে ছেড়ে যাচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শতাধিক লঞ্চ বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যায়।

কথা হয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক মো. আলমগীর কবির জানান, এবারও আমরা শক্ত অবস্থানে রয়েছি। কোনো অবস্থায়ই লঞ্চের ছাদে লোক উঠতে দেয়া হচ্ছে না। অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানোর সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এবার ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা হয়েছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post