১টি সেতুর জন্য দুর্ভোগে ৭০ হাজার মানুষ



অনলাইন ডেস্কঃ মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাজিরবাজার এলাকায় মনুনদীতে নেই সেতু। এতে মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর ও সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৭০ হাজার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বর্ষায় নৌকা, শুষ্ক মৌসুমে বাঁশের সাঁকো আর শুকিয়ে গেলে হেঁটে পার হতে হয় নদী।

এলাকাবাসী জানান, এই এলাকা দিয়ে তিনটি উপজেলার ৩৮টি গ্রামের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ চলাচল করে। এসব মানুষকে শহরসহ বিভাগের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের জন্য নদীটি পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ পাশে তথা ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজিরবাজার এলাকায় এসে সেখান থেকে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনে যাতায়াত করতে হয়। শুধু তাই নয়। এখানে তৈরি করা বাঁশের সাঁকো পারি দিতে যেয়ে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা।

এইতো মাত্র দি কয়েক আগে ঘটনা। দশম শ্রেণির ছাত্রী তারিন গত ৬ মার্চ সকালে এলাকার সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যাচ্ছিল। দুর্ঘটনাবশত সেদিন সাঁকো থেকে পড়ে গিয়ে সে গুরুতর আহত হয়। বর্তমানে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তারিন।

তারিনের স্বজনরা জানাল, কয়েক দিন পরপরই এমন ঘটনা ঘটছে। সাঁকো থেকে পড়ে কারও পা ভাঙছে, কারও ভাঙছে হাত। বিশেষ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা এ ঘটনার শিকার বেশি হচ্ছে। আর এ ভয়ে ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থীই লেখাপড়া ছেড়ে জড়িয়ে পড়েছে অন্য কাজে।

এখানেই শেষ নয়। কয়দিন পরপর তারিনের মত অনেক ছাত্র/ছাত্রীকে পড়তে হচ্ছে দুর্ঘটনার মুখে। প্রতি বছর বর্ষায় ছাত্র/ছাত্রীদের নিয়ে পারাপারের নৌকা ডুবে যায় মনু নদীতে। এদিকে নদী পারাপারের ভয়ে অনেকেই অল্প বয়সে লেখাপড়া ছেড়ে অন্য কাজে লেগে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ওই ৩ উপজেলার ৩৮টি গ্রামের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা যাতায়াতের অভাবে লেখাপড়া ও উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যার ফলে সার্বিক শিক্ষার দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছে বৃহত্তর ওই অঞ্চলটি। বাড়ছে বেকারত্ব।

ঝুঁকি জেনেও থেমে নেই মানুষের চলাচল। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাজিরবাজার সংলগ্ন প্রায় ৬০০ ফুট প্রস্থ মনুনদীতে এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বর্ষায় নৌকা, শুষ্ক মৌসুমে বাঁশের সাঁকো আর শুকিয়ে গেলে হেঁটে নদী পার হচ্ছে হাজারো ছাত্রছাত্রীসহ লক্ষাধিক মানুষ।

এদিকে সেতু না থাকায় বর্ষকালে রাতের বেলায় নদী পারাপারে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। রাত হয়ে গেলে দেখা দেয় নৌকা সংকট। তাই দুর-দূরান্ত থেকে বাড়ী ফিরতে দেরী হলে পোহাতে হয় দুর্ভোগ।

গর্ভবতী মহিলা সহ শিশুদের জরুরী চিকিৎসার জন্য যখন তখন শহরে না আসতে পারার কারণে বেড়ে যায় মৃত্যু ঝুঁকি। আর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উন্নত কৃষি ব্যবস্থা এবং কৃষি পণ্য বিপণন করতে সমস্যায় পড়ছেন এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী জানান, ওই জায়গায় ব্রিজ নির্মাণের জন্য স্বাধীনতার পর থেকে অবধি যখন যে সরকার ক্ষমতায় গেছে তারাই আশ্বাস দিয়েছে কিন্তু ভোটের পর আর কারো দেখা মেলেনি। অনেক আবেদন তদবির করের আশা জাগেনি ৩ উপজেলার ৩৮টি গ্রামের প্রয়োজনের জরুরী এই ব্রিজের।

কাজিরবাজারের ব্যবসায়ী বদরুল হাসান জোসেফ জানান, প্রায় ৬০০ ফুট দীর্ঘ মনুনদীর ওই জায়গা দিয়ে পারাপারের জন্য এলাকাবাসী নিজেরা চাঁদা তুলে বর্ষায় নৌকা ঠিক করে রাখে আর শীতে তৈরি করা হয় বাঁশের সাকো।

তিনি জানান, বর্ষা মৌসুমে ২টি নৌকা এবং শুকনা মৌসুমে পাশাপাশি ২টি সাঁকো দিয়ে পারাপার হন ওই ৩ উপজেলার ৩৮ গ্রামের লক্ষাধিক নারী-পুরুষ। বর্ষা মৌসুমে সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নদীতে নৌকা পাওয়া যায়। রাত ১০টার পরে ওই নদীতে মাঝি থাকেন না। মাঝি না থাকায় চরম দূর্ভোগে পড়তে হয় বাজার করতে আসা, শহর থেকে ফিরে আসা ও অন্যান্য জায়গা থেকে বাড়ি ফেরা মানুষের।

এদিকে বাড়ি আসতে হলে কামালপুর ইউনিয়নের নয়াব্রিজ হয়ে প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার ঘোরে আসতে হয় অথবা ওপারে কারো বাড়িতে বা নদী পাড়ে বসে রাত্রি যাপন করতে হয়।  প্রসূতি রোগীদের অমানবিক কষ্টে পরতে হয়।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক এবাদুল হক দুলু জানান, একটি সেতুর জন্য হাজারো ছাত্র-ছাত্রী বিপাকে। শীতে মোটামুটি ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি থাকলেও বর্ষায় নদী পারাপারের ভয়ে উপস্থিতি থাকে হাতে গোনা। নদীর ওই পারে গিয়ে বর্ষায় ক্লাস নিতে ভয় পান শিক্ষকরা কারণ বর্ষায় মনু নদী থাকে উত্তাল।

নদীর পূর্ব পারে অবস্থিত মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর ও সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার পাগড়িয়া, সোনানুয়া, আব্দুল্লাহপুর, মিরপুর, পালপুর, আমওয়া, সুমারাই, চাঁনপুর, কাশিমপুর, মধুপুর, অন্তেহরি, কাদিপুর, জগৎপুর, ইসলামপুর সোনাপুর, ওয়াবদাবাজার, জুম্মাপুর, গালিমপুর. পইলনপুর সহ আরো কয়েকটি গ্রামের অবস্থান। এইসব গ্রামে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ হাজার লোকের বসবাস।

নদীর দক্ষিণ পাশে অর্থাৎ মৌলভীবাজার-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হাট-বাজার, হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দিরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকায় মনুনদী পার হয়ে কাজিরবাজার দিয়ে ওই সব প্রতিষ্ঠানে যেতে চরম দূর্ভোগের স্বীকার হন তারা। ওই গ্রামরে শিক্ষার্থীরা নদী পার হয়ে আপ্তাব উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, খলিসপুর আলিম মাদ্রাসা, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ, মহিলা কলেজ সহ বিভিন্ন কাজে নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়।

ওই গ্রাম গুলোর মধ্যে বড় কোন বাজার না থাকার কারণে এলাকার লোকজন প্রতিনিয়ত হাট-বাজার করার জন্য ওই নদী অতিক্রম করে আসতে। ঝুঁকির মধ্যে সাঁকো দিয়ে মালামাল পারাপার করতে হয় তাদের ।

নদীর পশ্চিম পারে আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে কাজিরবাজার, বেকামুড়া, পাঠানটুলা,  উম্মরপুর, বাউরভাগ, গোলাপগঞ্জ, কর্মচিতা, খালিশপুর, বাশুদেবশ্রী, নাদামপুর, যমুনীয়া,  গোড়াখাল ও শ্রীদরপুর এলাকার লোকজন মনুনদী অতিক্রম করে উত্তর পাশের সেওয়াইঝুড়ি ও কাউয়াদীঘি হাওরের কৃষি জমিতে চাষাবাদ, শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাওয়া ও আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগাযোগসহ নানা কাজে প্রতিনিয়ত যেতে হয়। বিশেষ করে বোর ও আমন মৌসুমে কৃষি জমির ফসল ঘরে তুলতে তাদেরকে সীমাহীন কষ্টের স্বীকার হতে হয়। পূর্ব পারে বৃহত্তম কাউয়াদিঘী হাওরের অবস্থান।

সম্প্রতি সাকো থেকে পরে আহত তারিনের বাবা মুহিত মিয়া সহ অভিভাবকরা জানান, বর্ষা মৌসুমে নৌকায় পারাপার হতে গিয়ে নদীতে নৌকা ডুবে যায়। ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হয়। যার কারণে ছেলে মেয়দের সময় মতো ক্লাসে ও পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করা সম্ভব হয়না। সমস্যা যেহেতু নিজে চোখেই দেখছেন তাই স্কুলে যাবার জন্য চাপও দিতে পারেন না ছেলে মেয়েদের।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ভিপি মিজানুর রহমান বলেন, এই সেতুর জন্য আমি নিজেও বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করেছি এবং বিভিন্ন সময় আন্দোলন করেছি কিন্তু কোন কাজ হয়নি। এলাকার মানুষের দূর্ভোগের কথা চিন্তা করে যত দ্রুত সম্ভব এখানে একটি ব্রিজ নির্মাণ করে দিলে এলাকার মানুষ নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারবে।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার (সদর-রাজনগর) এর সাংসদ ও প্যানেল স্পিকার সৈয়দা সায়রা মহসিন বলেন, আমি এই সেতুর ব্যাপারে সংসদে দাবী জানিয়েছি আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি সেতুটির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Post a Comment

Previous Post Next Post