ডাঃ সাঈদ এনামঃ এক সাথে অধিক সংখ্যক মানুষ কে দ্রুততম সময়ে হত্যার করার জন্যে আলফ্রেড নোবেলের আবিষ্কার সে সময়ে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের নিকট খুব জনপ্রিয় হয়ে যায়। একেকটা আবিষ্কার এর পেটেন্ট কিনতে সে সময় রীতিমত কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। এমনি এক সময় কারখানায় ডিনামাইট আবিষ্কার এর এক পরীক্ষায় আলফ্রেড নোবেলের আপন ভাই সহ আরো ক'জন তার সামনেই জীবন্ত পুড়ে মারা যান।
তিনি বসে থাকেন নি। তার বোধোদয় হয়নি। দ্রুততম সময়ে মানুষ হত্যা করার পদ্ধতি "ডিনামাইট বিস্ফোরক" আবিষ্কার এর নেশা তার বাড়তে থাকে দিনকে দিন।
যদিও বা নাইট্রো গ্লিসারিন এর মুল আবিষ্কারক এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে নোবেল কে এ নিয়ে গবেষণা করতে বারণ করেন, তথাপি তিনি তাতে কর্ণপাত করেন নি। কত নিঁখুত উপায়ে বিস্ফারণ ঘটিয়ে দ্রুততম প্রাণনাশ করা যায় সেই গবেষনা নিয়ে তিনি দিনরাত মগ্ন থাকেন।
এসময় হঠাৎ করে তার আরেক ভাই মারা যান, যিনি ছিলেন এসব নিত্যনতুন বিস্ফোরক আবিষ্কার এর সহযোগী। তার মৃত্যুর পর এক সাংবাদিক দুখঃ করে পত্রিকায় একটা লিড নিউজ করেন
"মানুষ হত্যার এক ব্যবসায়ীর অবশেষে মৃত্যু"।
নোবেলের গোচরীভূত হয় পত্রিকার এই নিউজ টি। এটা তাকে ব্যাথিত করে। তিনি তার আবিষ্কার এর ভয়াবহতা টের পেতে থাকেন।
কিন্তু অনেক দেরী হয়ে যায় কারন ইতোমধ্যে তিনি বিস্ফোরক গুলোর পেটেন্ট বিক্রি করে দিয়েছেন দেশ বিদেশের বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবসায়ী দের কাছে। কোটি কোটি টাকা কামিয়ে হয়ে গেছেন বিজনেস টাইকুন। সারা বিশ্বে গড়ে তুলেছেন প্রায় শতাধিক নাইট্রোগ্লিসারিন দিয়ে তৈরি বিস্ফোরক এর অস্ত্রের কারখানা। এবং তা দিয়ে হয়ে যান পৃথিবীর সেরা ধনী। আর এদিকে এই অস্ত্র দিয়ে দ্রুততম সময়ে লক্ষ লক্ষ মানব হত্যা চলছে নির্বিচারে।
যাহোক সাংবাদিকের নিউজটির হেডলাইনটি তাকে পীড়া দিয়ে যাচ্ছিলো নীরবে নিভৃতে। তিনি ধীরেধীরে অনুভব করতে থাকলেন কি ক্ষতি তিনি করে বসেছেন মানব জাতির জন্যে , চোখের সামনে দেখতে লাগলেন তার আবিষ্কৃত অস্ত্রের অমানবিক প্রয়োগে লক্ষ লক্ষ মানুষের জলন্ত মৃত্যু ।
মনে মনে ভাবলেন, না এ হতে পারেনা। ভবিষ্যতে তিনি বিশ্বের মানুষ জাতির নিকট "মানব হত্যাকারী" একজন আবিস্কারক হিসেবে বেঁচে থাকতে চান না। তার প্রায়শ্চিত্ত করা উচিৎ। তিনি মানব হীতৈষী একজন বিজ্ঞানী হিসেবে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকতে চান মানুষের হৃদয়ে। কিন্তু কিভাবে সম্ভব ..?
তিনি সিদ্ধান্ত নেন, যেহেতু তার কোন স্ত্রী সন্তান সন্ততি নেই, তাই তার সকল সম্পদ চ্যারিটি অর্গানাইজেশন করবেন। মৃত্যুর আগে তাই তার সকল সম্পদ উৎসর্গ করেন আর্তমানবতার সেবায়। সুচনা হয় যারা মানুষের সেবায় কাজ করবে তাদের জন্যে "নোবেল প্রাইজ" প্রবর্তণের। বিশ্বে যারা শুধুমাত্র মানব সেবায় আত্মনিয়োগ করবে কেবল তারাই পাবে কাংখিত সেই নোবেল শান্তি পুরস্কার।
সেই মহান সাংবাদিক এর লিড নিউজের কল্যানে নোবেলের বিবেক জাগ্রত হয়েছিলো বটে, কিন্তু তার কর্মের ফল এখনো ভোগ করতে হচ্ছে মানব জাতির এবং সেটা মনে হয় পৃথিবী ধ্বংস হবার আগ পর্যন্ত চলতে থাকবে। হয়ত এমন ও হতে পারে তার এই আবিষ্কার দিয়েই ধ্বংস হবে এ পৃথিবী।
অবাক ব্যাপার হলো বিজ্ঞানী নোবেলের ছিলো হৃদরোগ,এনজাইনা পেকটোরিস। আজীবন তিনি হৃদরোগের ব্যাথায় (এনজাইনা পেকটোরিস) ভুগেছেন। মাঝেমধ্যে হার্টের তীব্র ব্যাথা হলে কুকরে পড়ে থাকতেন গবেষনাগারে। হায় তিনি জানতেন না, যে নাইট্রোগ্লিসারিন নিয়ে তিনি বিস্ফোরক আবিষ্কার এর গবেষণায় নেশায় মত্ত ছিলেন সেই নাইট্রোগ্লিসারিনেই ছিলো তার আজন্মকাল ভোগা হৃদরোগের (এনজাইনার) উপশম কারী মহৌঔষধ।
সে সময় চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বসে থাকেন। তারাও গবেষনা শুরু করেন নাইট্রোগ্লিসারিন নিয়ে। তবে নোবেলের মতো বিস্ফারক অস্ত্র বানিয়ে মানব হত্যা নয় বরং হার্টের অসুখের ব্যাথা থেকে মানুষ কে বাঁচাতে। ১৮৭৮ সালের দিকে সেই নাইট্রোগ্লিসারিন নিয়ে গবেষনা করে চিকিৎসা বিজ্ঞানী উইলিয়াম মারেল আবিষ্কার করেন হৃদরোগ "এনজাইনা পেকটোরিস" এর তড়িৎ উপশমকারী মহৌষধ ঔষধ নাইট্রো গ্লিসারিন স্প্রে বা ট্যাবলেট যা এখন আমরা তীব্র হার্টের ব্যাথা হলে জিহবার নীচে স্প্রে করি বা জিহ্বার নীচে রাখি। কিন্তু নোবেলের জন্যে সে মানুষের কাছে নাইট্রোগ্লিসারিনটি একটি মানুষ হত্যাকারী আতংক, বিস্ফোরক হিসাবে পরিচিত থাকায় চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এর নাম চেঞ্জ করে "গ্লিসারিন ট্রাই নাইট্রো" বা "ট্রাইনাইট্রিন" হিসেবে অভিহিত করেন।
মৃত্যুকালে আলফ্রেড নোবেল ছিলেন একা বড় একা, "ডিপ্রেশনে" জর্জরিত এক নিঃসঙ্গ মানুষ। আপন বলতে তার তেমন কেউ ছিলোনা। না তিনি কাউকে ভালবাসেন, না তাকে কেউ ভালোবেসে বিয়ে করে। তার সকল ভালোবাসাই ছিলো মানুষ হত্যার বিস্ফোরক ডিনামাইট আবিষ্কার কে ঘিরে।
সম্ভবত তার আবিষ্কৃত বিস্ফোরকে লাখ লাখ মানুষের জ্বলন্ত মৃত্যু দেখে "গিলটি ফিলিংস" থেকেই শেষ দিকে তার মানসিক রোগ বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন টি মারাত্মক জেঁকে বসে। তেষট্টি বছর বয়সে কোন এক রজনীতে তার সেই আজন্ম ভোগা হৃদরোগ "এনজাইনা পেকটোরিস" এর জটিলতা থেকে আচমকা ব্রেইন স্ট্রোক করে তিনি মারা যান।
ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ
এমবিবিএস ( ডিএমসি কে- ৫২) এম ফিল (সাইকিয়াট্রি)
সাইকিয়াট্রিস্ট ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।
