ইমাদ উদ দীনঃ ত্রাণের জন্য প্রতীক্ষা অভূক্ত বন্যার্তদের। কিন্তু মিলছেনা ত্রাণ। তাই চরম হতাশ দূর্ভোগগ্রস্থ মানুষ। পরিবার পরিজন নিয়ে দিন কাটছে অর্ধহারে অনাহারে।
এ দূর্দিনে সরকারের তরফে এ পর্যন্ত যে ত্রাণ সহায়তা আসছে তা যেমন পর্যাপ্ত নয়। তেমনি বরাদ্দ গুলোও সঠিক ভাবে দূর্গতদের হাতে না পৌঁছারও অভিযোগ উঠছে। একারনে বন্যা দূর্গত বিভিন্ন এলাকায় তোপের মুখে পড়ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। ঘটছে এমন নানা অনভিপ্রেত ঘটনাও। আর নানা কারনে অন্যবারের মত এবার রাজনৈতিক দলগুলোও বন্যা দূর্গতদের পাশে দাঁড়াচ্ছে কম। ব্যক্তি,সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের ত্রাণ সহায়তার উদ্দ্যোগও নামমাত্র। এবার দফায় দফায় বন্যা। বানের পানিতে তলিয়ে গেছে সব। এমন দূর্যোগে বিপর্যস্ত হাওর পাড়ের মানুষ। সর্বশেষ বন্যায় তলিয়ে দিয়েছে তাদের মাথাগুঁজার ঠাঁইও। সবকিছু হারিয়ে এখন নি:স্ব হাওর পাড়ের বাসিন্ধারা।
গেল ক’দিন থেকে থামছেনা উজানের পাহাড়ী ঢল আর বৃষ্টি। তাই বানের পানি কমারও কোন লক্ষণ নেই। বরং বাড়ছে পানি। আর ডুবছে নতুন নতুন এলাকা। হাকালুকির হাওর তীরবর্তী জেলার কুলাউড়া,জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার প্রায় ২৫টি ইউনিয়নের দুই শতাধীক গ্রাম এখন বন্যা কবলিত। এসব এলাকায় বন্যা যত দীর্ঘ স্থায়ী হচ্ছে ততই বাড়ছে দূর্ভোগগ্রস্থ মানুষের অসহায়ত্ব। ঘর বাড়ি হারা মানুষগুলো ইতিমধ্যেই ঠাঁই নিয়েছেন অন্যত্র। নিজের আতœীয় স্বজন কিংবা আশ্রয় কেন্দ্রে। সেখানেও তারা পানিবন্ধি। নানা সমস্যা ও সংকটে ওই আশ্রিত স্থানেও চরম বিড়ম্বনা। ঘরে চাল নেই। নেই নূন,মরিচ তেলও। রান্নার উপকরণ আর অনুসঙ্গ সবই অর্পযাপ্ত। তাই অনাহারে অর্ধাহারে কাটছে তাদের দিন। বানের পানিতে সবই তলিয়ে যাওয়ায় নেই আয় রোজগার। ঘরের উর্পাজনক্ষম লোকজনও কাটাচ্ছেন কর্মহীন সময়। এমন দূর্দিনে কর্পদক শূন্য এ মানুষগুলো চরম অসহায়। তাই এখন ত্রাণই তাদের একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা। ত্রাণের জন্য প্রতীক্ষা। ত্রাণ পেলে আহার। না পেলে অভূক্ত থাকছেন তারা।
২০০৪ সালের বন্যার পর এখন এমন দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়েছেন হাকালুকি হাওর তীরের মানুষ। তবে এবারকার বন্যার মত এতো দূর্ভোগ বা ক্ষতির শিকার হননি হাওর পাড়ের লোকজন। চৈত্রের অকাল বন্যায় তলিয়ে দিয়েছে তাদের সোনালী ফসল বোরো ধান। এরপর পচাঁ ধানের বিষক্রিয়ায় মরেছে দেশীয় প্রজাতির মাছ,হাঁস,জলজপ্রাণী ও উদ্ভিদ। এরপর ক্রমাগত বন্যায় তলিয়ে গেছে একের পর এক সবজি ক্ষেত, কৃষিজমি,মৎস্য খামার আর গবাদি পশুর খাদ্য ও বাসস্থান। অতিসম্প্রতি সর্বশেষ বন্যায় ডুবিয়েছে বাড়ি ঘর,রাস্তা ঘাট,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপসনালয়। একে একে সবতলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পানি। সময় যত যাচ্ছে পানিতে টইটুম্বর হাওর নিজের জলসীমানা ছাড়িয়ে এখন গিলে খাচ্ছে তীরবর্তী গ্রাম। উত্তাল হাওরের এমন রাক্ষুসে আচরনে নি:স্ব হচ্ছেন হাওর পাড়ের বাসিন্ধারা। তাদের চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। স্থানীয় বাসিন্ধারা জানালেন আগে বন্যা হলেও এখনকার মত এত দীর্ঘস্থায়ী হতনা। কিন্তু এখন বর্ষা মৌসুমে হাওর যেমন পানি ধরে রাখতে পারেনা। তেমনি শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমি। এর অন্যতম কারন হাওরের নাব্যহ্রাস। তারা ক্ষোভের সাথে অভিযোগ করে বলেন সরকার এই হাওর থেকে যে পরিমান রাজস্ব পায় তার নূন্যতম অংশ যদি এই হাওর উন্নয়নে ব্যয় করত তাহলে আজ আমাদের এমন দূর্দশা হতনা। তারা বলেন হাকালুকি হাওর দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হলেও আজ পর্যন্ত হাওরটি হাওর উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় নেওয়া হয়নি। হাওরটি নিয়ে শিগগিরই কোন উন্নয়ন পরিকল্পনা না নিলে আগামীতে আমাদেরকে এবারের মত আরো বড় বির্পযয় মোকাবেলা করতে হবে।
সরজমিনে হাকালুকি হাওর পাড়ের কুলাউড়ার ভূকশিমইল ইউনিয়নের সাদিপুর, মীরশংকর, গৌরিশংকর, কানেশাইল, কানেহাত, বাদে ভূকশিমইল, চকাপন ও জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের শাহপুর ও বেলাগাঁও এলাকায় গেলে চোখে পড়ে ত্রাণের জন্য বন্যার্ত অসহায় মানুষের হাহাকার। হাওর পাড়ের ওই গ্রাম গুলোতে কোন অপরিচিত মানুষের নৌকা বিড়তে দেখলে শতশত নারী,পুরুষ ও শিশু ত্রাণের জন্য ভীড় করছেন। ত্রাণ পেতে তারা হুমড়ি খেয়ে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। আর তাদের অসহায়ত্বের কথা কান্নাজড়িত কন্ঠে তুলে ধরছেন। জানাচ্ছেন পানিবন্ধি অবস্থায় তাদের পরিবার পরিজনের অভূক্ত থাকার কথা। তাদের এমন মানবিক আবেদন আর অসহায়ত্ব দেখে যে কারো দরদ জাগে। কারন এমন পরিনতির জন্য তারা নিজেরাই দ্বায়ি নয়। তারা অলস নয়। কর্মটও কৃষি আর মৎস্যজীবী এ মানুষগুলো কখনো ত্রাণের জন্য পথ চেয়ে থাকতে পচন্দ করে না।
তারা নিজেদের শ্রমে ঘামে অন্যের মুখে অন্ন তুলে দিয়ে আনন্দ পায়। কিন্তু এবছর প্রাকৃতিক বির্পযয়ে তাদের এমন বেহাল দশা। বন্যা কবলিত হওয়ায় ওই এলাকাগুলোতে শুধু খাদ্য আর বাসস্থান সংকট নয়। বিপর্যস্ত হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থাও। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (প্রাথমিক) আব্দুল আলিম জানান, জেলায় মোট ১৪২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যা কবলিত হওয়ায় পরিস্থিতি উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তা অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (মাধ্যমিক) আব্দুল ওয়াদুদ জানান, হাওর পাড়ের মাধ্যমিক বিদ্যালয় গুলো বানের পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বানের পানিতে বিদ্যালয় গুলো তলিয়ে যাওয়ায় জেলায় ৪২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। পানি কমলে এসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম চালু হবে। জেলা প্রশাসন কার্যালয় সুত্রে জানা যায় জেলায় সর্বশেষ ২৯ মেট্রিকটন জিআর চাউল ও নগদ ১০ লক্ষ টাকা এবং ৫৯ হাজার ২০০ ভিজিএফ কার্ডের অনুকূলে ১০ কেজি করে চাউল বিতরণ করা হয়েছে। সবমিলিয়ে তিন ধাপে ৬৫০ মেট্রিকটন চাল, ৩০ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা ছাড়াও তিন মাসের জন্য ৫ হাজার ভিজিএফ কার্ডের অনুকূলে প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল এবং ৫০০ টাকা করে দেয়া হচ্ছে। তবে হাওর তীরের বন্যা কবলিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জানান এপর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের জন্য যে সরকারী বরাদ্দ এসেছে তা চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। ওই বরাদ্দ গুলো দূর্ভোগগ্রস্থ সবাইকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা বলে আমরা তাদের তোপের মুখে পড়ছি। আর নানা মন্দ কথাও শোনতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা গুলোর নির্বাহী কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের হিসাব অনুযায়ী আমরা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি। তবে কয়েক দফা বন্যা হওয়ায় বন্যা কবলিত ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পরিসংখ্যানও দিন দিন বাড়ছে। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা যায় কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় হাকালুকি হাওরের পানি ভাটির দিকে প্রবাহিত হতে না পেরে বন্যার সৃষ্টি হয়ে নতুন নতুন এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। মার্চ ও এপ্রিলের বন্যার পর এটি মৌলভীবাজারে ৩য় দফা দীর্ঘস্থায়ী বন্যা।
