লারার মাঠে মাশরাফিদের স্বপ্ন

লারার মাঠে মাশরাফিদের স্বপ্ন
স্পোর্টস ডেস্কঃ জেমস ওয়াটের শহর বার্মিংহাম! জোসেফ প্রিস্টলির শহর বার্মিংহাম! যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তর এই শহরে থেকেই ‘বাষ্পীয় ইঞ্জিন’ আবিষ্কার করেছিলেন জেমস ওয়াট। আর প্রিস্টলি আবিষ্কার করেছিলেন ‘অক্সিজেন’। তবে ক্রিকেটে বার্মিংহাম হচ্ছে ব্রায়ান লারার শহর! ক্যারিবীয় এই কিংবদন্তি ক্রিকেটার এই শহরের এজবাস্টন ক্রিকেট মাঠেই গড়েছেন ক্রিকেটের ইতিহাসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের স্কোর! ১৯৯৪ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে (কাউন্টি) ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে ডারহামের বিরুদ্ধে খেলেছেন ৫০১ রানের অপরাজিত ইনিংস। ক্রিকেটের ইতিহাসে এখন যা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

ব্রায়ান লারার সেই অমর কীর্তি গড়ার মাঠেই এবার নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছেন টাইগাররা। সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ভারত। তবে এ নিয়ে মোটেও মাথাব্যথা নেই বাংলাদেশের। প্রতিপক্ষকে নিয়ে ভাবার সময় পেরিয়ে এসেছেন মাশরাফিরা। এখন বাংলাদেশ কেবল নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। প্রতিপক্ষ দুর্বল না শক্তিশালী তা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট না করে বাংলাদেশ ভাবছেন কীভাবে নিজেদের সেরা খেলাটা উপহার দেওয়া যায়।

আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আসার আগে বাংলাদেশের টার্গেট ছিল অন্তত একটি জয়! সেখানে সেমিফাইনালে উঠে গেছে দল। এটাই অনেক বড় প্রাপ্তি। তাই শিষ্যদের ওপর কোনো রকম চাপ প্রয়োগ করছেন না কোচ চন্ডিকা হাতুরাসিংহে। বরং ক্রিকেটারদের প্রতি কোচের বারতা, ‘এটা বড় ম্যাচ নয়, বড় সুযোগ!’

‘বড় ম্যাচ’ মনে করলেই নিজের মধ্যে বাড়তি চাপ অনুভব করতে পারেন ক্রিকেটাররা। তখন স্বাভাবিক পারফরম্যান্স প্রদর্শন করাও কঠিন হয়ে যাবে। এটা খুব ভালো করেই জানেন হাতুরাসিংহে। তাই শিষ্যদের বলে দিয়েছেন, এটা অনেক বড় সুযোগ। হারলে কোনো ক্ষতি নেই, জিতলে মহাপ্রাপ্তি! বার্মিংহামের এই এজবাস্টনে মাশরাফিদের ভালো মন্দ দুই রকম স্মৃতিই আছে। এই মাঠেই যে প্রস্তুতি ম্যাচে পাকিস্তান ও ভারতের বিরুদ্ধে দুটি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। যদি দুই ম্যাচেই হেরে গেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ করেছিল ৩৪১ রান, আবার ভারতের বিরুদ্ধে ইনিংস গুটিয়ে গিয়েছিল মাত্র ৮৪ রানে। তবে অধিনায়ক মাশরাফির মন্ত্র, ‘নেতিবাচক ঘটনাগুলোকে মন থেকে মুছে ফেল, ইতিবাচক ঘটনার স্মৃতিচারণ করে উজ্জীবিত হও। ’ একটা সময় ছিল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের ম্যাচ মানেই দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করতো। কালের বিবর্তনে এখন পাকিস্তানের জায়গায় বাংলাদেশ চলে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমর্থকদের মধ্যে চলছে ‘বাংলাদেশ-ভারত যুদ্ধ’! এমন যুদ্ধ খারাপ নয়, বরং ক্রিকেটের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। তবে এই যুদ্ধটা শালীনতার সীমা অতিক্রম না করলেই ভালো।

শুধু সমর্থকদের মধ্যে নয়, দুই দলের কোচ-ক্রিকেটারদের মধ্যেও একটা মিষ্টি যুদ্ধ চলছে! তবে একে ঠিক যুদ্ধ না বলে ‘মাইন্ড গেম’ বলাই ভালো। এই ‘মাইন্ড গেম’ এখানে কে এগিয়ে বা কে পিছিয়ে তা বোঝা যায় না! তবে বাংলাদেশের কোচ হাতুরাসিংহে যে এমন গেমে ভীষণ পারদর্শী তা বোঝা গেল গতকালকের সংবাদ সম্মেলনেই। ভারতীয় এক সাংবাদিকের প্রশ্ন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ও ভারতের পেসারদের মধ্যে তুলনা করতে বললে কাকে এগিয়ে রাখবেন আপনি?

হাতুরার উত্তর, অবশ্যই বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখব আমি। পেস বোলিংয়ে আমার ছেলেদের মধ্যে কত বৈচিত্র্য! ভারতে এমন বৈচিত্র্য কোথায়! আরেক প্রশ্ন, ভারত তো ভয়ঙ্কর দল। সেমিফাইনালে তাদের কীভাবে দেখছেন?

হাতরা— প্রতিপক্ষ কে তা নিয়ে আমরা মোটেও ভাবছি না। ছেলেদের বলে দিয়েছি, তোমরা ম্যাচটা উপভোগ কর। তবে শুধু এটুকু চেষ্টা যেন থাকে, নিজেদের সেরা খেলাটা দেখাতে পার। আর বাংলাদেশ দল যদি নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলে তারা যেকোনো দলকে হারানোর সামর্থ্য রাখে।

টাইগার কোচের ভাবনা যে তার শিষ্যদের খুব ভালোভাবে প্রভাবিত করেছে তা বোঝা গেল গতকাল প্র্যাকটিসের সময় ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষা দেখে। স্থানীয় সময় সাড়ে ৯টায় অনুশীলন শুরু হয় এজবাস্টন স্টেডিয়ামের ঠিক পাশের কোল্টস গ্রাউন্ডে। অনুশীলনের পুরোটা সময় হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন ক্রিকেটাররা। কখনো কখনো একে অপরের সঙ্গে হালকা দুষ্টমিও করছেন। ভারতের বিরুদ্ধে বড় ম্যাচ, কিন্তু টাইগারদের শরীরী ভাষার চিন্তার কোনো রকম ছাপ নেই। কোনো দল যখন এমন ফুরফুরে মেজাজে থাকে সেই দলকে হারানো কঠিন!

যদিও ভারত খুবই শক্তিশালী দল। এই টুর্নামেন্টে তারাই টপ ফেবারিট। তবে বাংলাদেশের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে শ্রীলঙ্কা! যদিও লঙ্কানরা শেষ পর্যন্ত সেমির টিকিট পায়নি। তবে ম্যাথুজরা গ্রুপপর্বে ভারতের দেওয়া ৩২২ রানের বিশাল টার্গেট তাড়া করেই জিতেছিল। যদি শ্রীলঙ্কা পারে তাহলে কেন বাংলাদেশ পারবে না? ক্রিকেটে অসম্ভব বলে কিছু নেই! ব্রায়ান লারার কীর্তি গড়ার এই এজবাস্টনে এবার কীর্তি গড়ুক টাইগাররা। সেমিফাইনালে ভারতকে হারিয়ে জেমস ওয়াট ও প্রিস্টলির শহরে সোনার হরফে নিজের নাম লিখুক বাংলাদেশ!

Post a Comment

Previous Post Next Post