"বংশের বাত্তি ... ৮ম পর্ব" -- ডা. সাঈদ এনাম

"বংশের বাত্তি ...  ৮ম পর্ব" -- ডা. সাঈদ এনাম
ডা. সাঈদ এনাম: 
"টেকো মাথার মতলুব ভাই,
কেবল করেন খাই খাই
ফোকলা দাঁতে হাসলে তাকে
লাগে যেনো বিড়ালের ভাই...।

অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসলে প্রায় সবাই একটু আদটু দ্বিধান্বিত থাকে। প্রথম বার ধরতে চায়না। চেয়ে রয়। পরের বার ধরে। তার আগে একটু চিন্তা করে নাম্বার টা পরিচিত কিনা। ওরকম ই ছিলো কল টা। আমি তখন চেম্বারে রোগী দেখছিলাম। রিসিভ করিনি, ভাবলাম পরে কল ব্যাক করবো।

ডাক্তার দের মোবাইলের শতকরা আশি ভাগ কল ই হয় এরকম অপরিচিত। বেশির ভাগ হয়ে কে রোগী দের ফোন। "স্যার আপনার চেম্বার টা জানি কই, একটু দেখাবো", " স্যার ওষুধ গুলো শেষ, কি করবো... আসবো" অথবা "স্যার আমার স্ত্রী এইমাত্র মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেছে বাথরুমে, কি করবো"। এমন ভাবে কাকুতি মিনতি করে যেন এই পৃথিবিতে ডাক্তার ই তার এক মাত্র আপনজন, শেষ ভরসা স্থল। ডাক্তার রা অবশ্য এতে খুব একটা বিরক্ত হন না। খুশিই হন। একটা পরামর্শ দিয়ে দেন তাৎক্ষণিক ।

তবে কিছু কিছু ফোনে তারা অল্প সল্প বিরক্ত বা বিব্রত হন মাঝে মধ্যে, যেগুলোর আবদার থাকে এরকম, "স্যার, আপনি একটা ভালো ডাক্তারের চেম্বারের এড্রেস দেন না" বা "অমুক ডাক্তারের এড্রেস টা কই বলবেন একটু", অথবা "ওষুধ কিনেছি এখব কি করবো, খাবো..." ইত্যাদি চাইল্ডিস ফোনে।

এই কথাগুলো একজন ডাক্তার কে, খুব নিকট না হলে ফোনে বলা ঠিকনা। এগুলো চেম্বারে গিয়ে একটু সময় নিয়ে গুছিয়ে বলতে হয়। কারন একজন চিকিৎসক তার যথাসাধ্য জ্ঞানের মাধ্যমেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন আপনার দ্রুত আরোগ্যের। তার পর যদি আপনার কথায়, ফোনে বা কাজে অবিশ্বাস বা সন্দেহের আভাষ থাকে তাহলে তিনিতো কিছুটা বিরক্ত হতেই পারেন। এটাই স্বাভাবিক। আপনাকে অন্য কারো কাছে পাঠাতে হলে তিনি নিজেই সেটা বলবেন। আপনার পীড়াপীড়ি করা মানে আপনি তাকে বিশ্বাস করছেন না।

একজন ডাক্তারের কাছে বিরক্তিকর বা আহতকর হচ্ছে রোগীর এই অবিশ্বাস। ডাক্তার যখন দেখেন রোগী তাকে বিশ্বাস করছেন না তখন তিনি তাকে ক্ষেত্র বিশেষে চিকিৎসা না দিয়ে অথবা দিয়েই রেফার্ড করে ফেলেন। তা আপনি যেই হোন না কেন। এটা ডাক্তার হিসেবে তার রাইট। তিনি চাইলে রোগীর চিকিৎসা নাও করতে পারেন।

অর্থাৎ পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান সুচিকিৎসার জন্য একটা বড় নিয়ামক। আমাদের দেশে ইদানীং কিছু ঘটনায় মনে হচ্ছে এই বিশ্বাসের ভিত্তিটাতে খানিখটা চিড় ধরছে, অথবা কেউ কেউ কোন অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে চিড় ধরাচ্ছে।

যাই হোক রোগী টাকে বিদায় দিয়ে আমি ঐ অপরিচিত নাম্বারে কল করলাম।
হ্যালো..
স্যার আসসালামু আলাইকুম..
ওয়ালাইকুম সালাম, কে? ফোন দিয়েছিলেন...
আমি পিংকি..
ও আচ্ছা কি ব্যাপার? কি মনে করে...?

না কিছুনা একটা পরামর্শ এর জন্য ফোন করলাম স্যার। বিরক্ত হবেন না তো। ভেবেছিলাম আসবো, কিন্তু সম্ভব না, দেরী হয়ে যাবে। সিদ্ধান্ত আমার এখুনি দরকার। তাই ফোন করলাম..। (একটু ফিস ফিস করে কথা গুলো বললো সে)

সমস্যা নেই বলো। আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম...

স্যার আমার হাসবেন্ড কে নিয়ে সবাই বিদেশ যেতে চান চিকিৎসার জন্য। শরীর টা উনার ভালোও যাচ্ছেনা আবার মন্দ ও না। মতলুব দুলাভাই এই উদ্যোগ নিয়েছেন। কে নাকি তাকে বলেছে, বিদেশ যেয়ে একবার ট্রাই করতে। বিদেশের চিকিৎসা নাকি খুব ভালো ভালো। কি করবো স্যার...?

আসলে ব্যাপার কি জানো আমিতো তোমার অসুস্থতা নিয়ে ভেবেছি, কাজ করেছি, কিন্তু তোমার হাসবেন্ড এর ব্যাপারটা আমি তেমন কিছুই জানি না। যেতে চাচ্ছে যাক না। অসুবিধা কি। আচ্ছা একটা ব্যাপার বলো এই আইডিয়া টা তোমাদের কে দিলো...। যিনি চিকিৎসা করছেন তিনি?

স্যার কে দিলো সেটা জানি না। তবে মতলুভ ভাই খুব আগ্রহী। তিনি চাচ্ছেন আমিও যেনো যাই তার সাথে। আর কেউ বিশেষ কারো যেতে হবে না। তাছাড়া ক'দিন আগে তিনি এই রকম তার এক দুঃসম্পর্ক আত্মীয় রোগীকে নিয়ে ও বিদেশ গিয়েছিলেন। সেখানে নাকি গিয়ে ধরা পড়ে তার কিছুই হয় নি!! ক্যান্সার ট্যান্সার সব মিথ্যা। সেই রোগী এখন ভালো, কেবল ক'দিন পর পর চেক আপে যেতে হয়। তিনি এভাবে আরো কয়েকবার রোগী নিয়ে গেছেন। অনেক কে পাঠিয়েছেন ও। জানাশুনা আছে ভালো। স্যার তাড়াতাড়ি বলবেন। ফ্যামিলি মিটিং চলছে। আমি বাথরুমের কথা বলে বেরিয়ে এসে আপনাকে লুকিয়ে ফোন দিচ্ছি...।

তুমি যাও। যাওয়া ভালো। আর মনে হয় আমার হ্যা বা না তে মতলুব সাহেবের সিদ্ধান্তে তেমন হের ফের হবেনা। বরং তুমি না বললে সেটা মন্দ হবে। তুমি বরং যাও। সাবধানে থাকো। চিন্তা করোনা। তবে যাবার আগে মতলুব সাহেব কে বলো আমার সাথে যেনো দেখা করে, তুমিও এসো। পারলে তোমার হাসবেন্ড এর চিকিৎসার কাগজ গুলো আনো...।

ঠিক আছে স্যার। আমি আসবো। উনাকে নিয়েই আসবো। স্যার আরেকটি কথা আমি ফেইস বুকে একাউন্ট খুলেছি। সময় কাঠেনা একা একা। আমার বান্ধবী পলি আইডিয়াটা দিয়েছে। ও খুব সুন্দর গান গায়। আপনাকে রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছি দেখবেন..। একটা ছোট কবিতা লিখেছি আমার হাসবেন্ড কে নিয়ে গতকাল, আর একটা ছড়া লিখেছি মতলুব ভাই কে নিয়ে। একটু শুনাই

"টেকো মাথার মতলুব ভাই,
কেবল করেন খাই খাই
ফোকলা দাঁতে হাসলে তাকে
লাগে যেনো বিড়ালের ভাই...।

হি হি স্যার...। দেখবেন কিন্তু ।

তাই নাকি। ভালো বেশ ভালো। দেখবো পরে..।

পিংকি ঝট পট রেখে দেয়।

পিংকির মন খুব ভালো। সম্ভবত সে তার হাসবেন্ড কে নিয়ে পজিটিভ কিছু ভাবছে। আমার নিজের ও ভালো লাগলো, যে মেয়ে ক'দিন আগে মনের দুঃখে আত্মহত্যার কথা ভাবতো সে এখন দিব্যি সুস্থ। কেবল সুস্থ যে তা নয়, ফেইস বুকে একাউন্ট খুলে মনের কথা গুলো লিখে রাখছে। ছড়া, কবিতা লেখার চেষ্টা করছে। ইটস এ ভেরী গুড সাইন। লেখালেখি করা খুবই ভালো একটা অভ্যাস। লেখালেখিতে মন ভালো থাকে।

'সবারই টুক টাক লেখা উচিৎ। লিখলে মন ভালো থাকে। এক সময় আপনি হয়তো থাকবেন না কিন্তু লেখাটা থাকবে'। আপনি বেঁচে রইবেন আপনার সুন্দর লেখনীতে। যুগ যুগান্তর রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের মতো।

লেখার জন্যে প্রতিভা প্রয়োজন তবে বেশি প্রয়োজন চর্চার। শুধু ধৈর্য নিয়ে লিখতে হয়। রাতারাতি লেখক হওয়া যায়না। লেখার জগতে এমন কেউ নেই যে, যিনি প্রথম দু এক লাইন লিখেই একেবারে বিশ্ব বিখ্যাত হয়ে গেছেন। সবার শুরু সেই প্রথম লুকিয়ে লুকিয়ে এক লাইন, দু লাইন বা এক পৃস্টা, দু পৃস্টা দিয়ে। তার পর গল্প বা উপন্যাস। আমরা হয়তো সেটা জানিনা।

ইদানিং ফেইসবুক ইন্টারনেট লেখাজোকা কে খুব সহজ করে দিয়েছে। মনের সুখ দুঃখ, আশা আকাঙ্ক্ষা র কথাটা লিখে দিয়ে খুব সহজেই তা পাঠক দের কাছে পৌছে দেয়া যায়। তারাও কমেন্টের মাধ্যমে মতামত দেয়। "ওফ দারুনহ হয়েছে", "অসাধারণ", "চমৎকার" ইত্যাদি নানান কমেন্টস।

মতামত বা ফিডব্যাক লেখক হয়ে উঠার পিছনে এক বড় শক্তি । এই ক'বছর আগেও যেটা সম্ভব ছিলোনা।

আগে লেখক রা কিছু লিখলে সেটা নিয়ে যেতেন তার পছন্দের কারো কাছে যেমন স্ত্রী বা বন্ধু বান্ধব । তাদের চোখের সামনে ধরতেন বার বার। "এই পড়না। প্লিজ দেখনা কেমন হলো লাইনটা। "হয়েছেতো...", "আমাকে দিয়ে হবেতো"। ইত্যাদি বলে বলে হয়রান করতেন।
"হুম পড়বো, পড়ছি..." এই বলে হয়তো তারাও সান্তনা দিতেন। পড়ার চেষ্টা করতেন। সময় চাইতেন।

লেখক কিন্তু অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেন কবে তার ফিডব্যাক আসবে। দেরী হলে মন খারাপ হতো তার। লেখাটা বোধ হয় ভালো হয় নি। এ জন্যে কেউ পড়ছেনা বা কেউ কিছু বলছেনা। কাট ছাট করতেন। আবেগ অনুভুতির ভাষা গুলো আরো শানিত করতেন। অথবা লেখার আগ্রহ হারাতেন, "ধ্যাত আর লিখবই না, আমাকে দিয়ে ওসব হবেনা এই বলে। পরে আর কাউকে পড়ার জন্যে বলতেন না ছাপার জন্যে প্রকাশক বা সম্পাদকের কাছে দ্বারস্থ তো হতেনই না।

তবে যদি দৈবাৎ স্ত্রী, বন্ধু বান্ধব লেখাটা ঝট পট পড়েন, বলেন " ওমা,খুব ভালো হয়েছেতো। এতো সুন্দর লেখা, জীবনেও পড়িনি"। ব্যাস হয়ে গেলো।
লেখক মনে মনে খুব আনন্দ পান। অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায় তার চিন্তা ভাবনায়। তিনি নিজেকে একজন লেখক ভাবতে শুরু করেন। কল্পনার জগতে হারিয়ে যান। স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। তিনি একজন পরিচ্ছন্ন লেখক। যথেষ্ট নাম ডাক। প্রতি বছরই তার দু'তিনটে বই বের হচ্ছে।

বাজারে অনেক বই তার। তার বই আর লেখা গুলো পত্রিকায় যাচ্ছে হামেশা। তিনি তার লেখার মাধ্যমে যে পরিবর্তন চেয়েছিলেন তাও তিনি দেখছেন সবার চোখেমুখে । হাঠে মাঠে গেলে পাঠক তাকে সালাম দিচ্ছে, অটোগ্রাফ চাইছে। "স্যার আপনি খুব ভালো লেখেন। আমি আপনার বড় ভক্ত। আপনিই ঠিক সমাজের এসব কুসংস্কার, ব্যবধান দূর হওয়া উচিৎ..... " ইত্যাদি কথা বার্তায় তিনি দারুন পুলকিত হচ্ছেন। কবি সাহিত্যিক দির আড্ডায় তিনি নিয়মিত যাচ্ছেন ইত্যাদি নানান স্বপ্ন।

এই সব স্বপ্ন কে সান্তনা দিতে হয়তো তিনি চুপি চুপি দুরু দুরু বুকে খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে প্রথম লেখাটাকে কবিতা, গল্প বা উপন্যাসে দাড় করান। এক সময় দ্বারস্থ হন প্রকাশক বা সম্পাদক এর কাছে। প্রকাশক বা সম্পাদক দু'এক পৃস্টা উল্টান। মতামত দেন "হুম ভালো তবে....মোটামুটি চলে..."
কিন্তু তিনি তেমন একটা গুরুত্ব দিতে চান না। প্রথম প্রথম। "এসবের বাজার মান্দা। পাঠক আজকাল বই পড়তে চায়না..."।ইত্যাদি কথা বার্তায় বুঝিয়ে দেন যে তিনি নতুন লেখক দের লেখা ছাপিয়ে রিক্স নিতে চাচ্ছেন না। বিক্রি হয় কম। পাঠক তৈরি হয় না। পাঠকরা পুরোতন দের মায়াজ্বালে বন্দী।

পুরাতন রা যাই লিখুক পাঠক চোখ বন্ধ করে কিনে। কাঠ পেন্সিল দিয়ে লেখে যদি নাম দেয় "এক খানা কাঠ পেন্সিল" তাও কিনবে। সেই বন্দীর মায়াজ্বাল ছিন্ন করা বেশ কঠিন।

কিন্তু লেখকের প্রচণ্ড আগ্রহ দেখে তিনি তখন শেষমেশ বিভিন্ন ধরনের ডিল বা শর্তে আসেন। "আমি ছাপবো, রিস্ক নিবো, কষ্ট করবো তবে একটা শর্ত...."।
লেখক রাজি হন শর্তে। তার টাকা পয়সার দরকার নাই। তিনি শুধু চান মানুষ যেনো তার লেখা গুলো পড়ে।

তার পর এক সময় তার বই বের হয়। তিনি পাজামা পাঞ্জাবী পড়া শুরু করেন। খদ্দের কাপড়ের সাদা পাঞ্জাবী। একটা সস্থা মোটা ফ্রেমের পাওয়ার লেস চশমাও পড়েন। পায়ে থাকে ফিতা ওয়ালা বাটা কোম্পানির চটি। কাঁধে একটি ব্যাগ ঝুলান। চকমকে রঙ এর। মেয়েদের ভ্যানিটিব্যাগ এর মতো বেগ। তবে একটু বড়।

ঐ বেগে রাখেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এর বই। এখানে সেখানে বসে পড়েন, ভাবেন। লিখেন। কাটাকুটি করেন। সুযোগ পেলেই সাহিত্য নিয়ে গল্প জুড়ে দেন। যে সাহিত্যের "স" ও বুঝেনা তাকে নিয়ে গল্প জুড়েন শেলি বা কিটস এর কাহিনী নিয়ে। লিখতে থাকেন ধৈর্য নিয়ে।

এভাবেই ধৈর্য ধরে ধীরে ধীরে একজন সাধারণ মানুষ লেখক হয়ে উঠেন। এক সময় হয়ে যান বিখ্যাত লেখক।পৃথিবীর সকল বিখ্যাত লেখকদের শুরু এই রকম অ আ, ক আর খ দিয়েই।

বিশ্বের তাবৎ কবি সাহিত্যিক দের মধ্যে নজরুল একটু ব্যতিক্রমী। অত্যন্ত দুঃখী কিন্তু অনন্য সাধারণ প্রতিভাবান। অভাব, দুঃখ আর শোষক দের সাথেই সংগ্রাম করে কেটেছে তার লেখক জীবন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ছিলো আশিটা। ব্রিটিশ রা দিয়েছে। পালিয়ে বেড়িয়েছেন, জ্বেল খেটেছেন। সশ্রম জেল। কিন্তু আপোষ করেন নি বেনিয়াদের সাথে। ও অবস্থাতেই হয়ে উঠেন একাধারে একজন সাম্যের কবি, মুক্তির কবি, উপন্যাসিক, গল্পকার, ছড়াকার, চিত্র পরিচালক, সম্পাদক, সাংবাদিক । সব, একে বারে সব দিক পরিপুর্ন। যেমন লিখেছেন মুসলমানদের জন্য গজল তেমনি লিখেছেন হিন্দ সম্প্রদায়ের জন্যে শ্যামা সংগীত। মুক্তির জন্য বিদ্রোহী, যুদ্ধের জন্য রণ সংগীত। তাই তার ছবি হিন্দু মুসলিম সবাই ড্রইং রুমে রাখে।

ছেলে বেলায় আমাদের বাংলা শিক্ষক, স্বর্গীয় শ্রী ননী গোপাল স্যার বলতেন, যে একবার ও বিদ্রোহী কবিতে পড়েনি সে কখনো পুরুষ হতে পারবেনা।

তবে সত্যি কথা, যে বয়সে কবি বা লেখক রা তার সব টুকু উজাড় করে দেন দুঃখজনক হলেও সত্য সেই বয়সেই কবি অসুস্থ হন রহস্যজনক ভাবে। তাঁর অসুস্থতা আজো রহস্যজনক।

দেশ স্বাধীন করে স্বাধীনতার সস্থপতি বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে নিয়ে আসেন বাংলাদেশে। সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। জাতীয় কবির সম্মান দেন। মৃত্যুর পর তার লাশ বহন করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী মসজিদের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। তাঁর নামে রাস্তা ঘাঠ স্থাপনা যেমন বাংলাদেশে আছে তেমনি ইন্ডিয়াতেও।

চেম্বার থেকে ফেরার পথে হঠাৎ খেয়াল হলো পিংকির ফোনের কথা। ও একটা ফেইসবুক একাউন্ট খুলেছে। আমাকে রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে। একটা কবিতা লিখেছে তার অসুস্থ হাসবেন্ড কে নিয়ে, আর একটা ছড়া মতলুব সাহেব কে নিয়ে। ছড়া টা ভালোই লিখেছে। মতলুব সাহেবের সাথে যায়।

"টেকো মাথার মতলুব ভাই,
কেবল করেন খাই খাই
ফোকলা দাঁতে হাসলে তাকে
লাগে যেনো বিড়ালের ভাই..."

আমি ফেইস বুক খুলেই সার্চ করলাম। কিন্তু বেশ কটা রিকুয়েস্ট। ওর যে কোনটা। পরে পেলাম। মতলুব সাহেব কে নিয়ে লেখা ছড়া দিয়ে দিয়ে ওর আইডি টা নিশ্চিত হলাম।

একটা ছোট বাচ্চার ছবি দিয়েছে প্রোফাইল পিকচারে। ভালো হলো। মাঝেমধ্যে ওর মনের অবস্থা বুঝা যাবে ফেইসবুক থেকে।

ফেইস বুক আইডি স্টাডি করলে একটা মানুষ সম্পর্কে ভালো ধারনা পাওয়া যায়। ইদানীং শুনেছি এর মাধ্যমে বর কনে দেখাদেখি হয়, বিয়েও নাকি হয়ে যায়। ভালোতো খরচ কমে গেলো। সেদিন পত্রিকায় দেখলাম আফ্রিকা থেকে উড়ে এসেছে এক মধ্যবয়সী মহিলা এক তরুনের প্রেম নিবেদনে সাড়া দিয়ে। কিন্তু গণ্ডগোল বেধে গেছে। প্রোফাইল পিকচার এর সাথে কিছুরই মিল নাই। মহিলার গায়ের রঙ বারাক ওবামার মতো আর দৈহিক গড়ন মাইক টাইসনের মতো। ছেলেরতো চোখের পানি নাকের পানিতে একাকার। আফ্রিকান মহিলাও নাছোড়বান্দা। যাক শেষমেশ গ্রাম্য সালিশে কি একটা সমাধান নাকি হয়েছে।

সবকিছুরই ভালো মন্দ দু'দিক আছে। ছেলেটার কপাল খারাপ বলা যায়। আসলে কম বয়সী ছেলে মেয়েদের এই একটা সমস্যা। পড়ালেখা বাদ দিয়ে সারাদিন ফেইসবুক। সমস্যা টা বেশ প্রকট হয়ে গেছে ইদানীং। পড়ালেখা শিকেয় উঠছে সবার। মারামারি, লাঠালাঠি হচ্ছে ফেইসবুকের স্ট্যাটাস নিয়ে। বাচ্ছারা গ্যাং তৈরি করছে।

সেদিন উত্তরায় দশ বারো বছরের ছেলেরা গ্যাং তৈরি করে এক পক্ষ আরেক পক্ষের ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। কি ভয়ানক অবস্থা। মাঝেমাঝে ভাবি ফেইসবুক ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলেই হয়। কিন্তু এতেও বাধা। মিছিল মিটিং শুরু হয়ে যায়।

তবে মনে হয় এটা নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ। কিছুকিছু সাইট বন্ধ করা, আর টাইমিং করে দেয়া উচিৎ । সারাদিন সারারাত ফেইসবুকিং চলবে না। শুধু দিনের বেলা কিছু সময় থাকবে। এতে অবশ্য প্রথম প্রথম টুকটাক মিছিল মিটিং, ভাংচুর সমালোচনা হবে। পরে ঠিক হয়ে যাবে। বাংগালীরা যে কোন ব্যাপারে অভ্যস্ত হয় খুব তাড়াতাড়ি। ভালো বা মন্দ হোক, যাচাই বাছাই ছাড়াই অভ্যস্ত হয়। যদি দেখে ইউরোপ আমেরিকান রা সকাল বিকাল টেবিল চামচ দিয়ে দু এক চামচ আলকাতরা খাচ্ছে তারাও হুজুগে আলকাতরা খাওয়া শুরু করবে। প্লেটের পর প্লেট।

আচ্ছা ইউরোপ আমেরিকান রা আলকাতরা কেনো খাবে। খাবে এটা তাদের বিজনেস। তারা খাবে বাংগালীদেরও খেতে বলবে। নিয়মিত আলকাতরা খেলে ভিতর কালো হয় আর বাহিরে রঙ ফর্সা হয়, আটা তাদের বিজ্ঞানীরা বলেছে। তারা বাংগালীদের প্রথম প্রথম ফ্রী সাপ্লাই দিবে। সাথে লবন ও পারলে দিবে স্বাধে মজা আনার জন্য। "লবনকাতরা"। বাংগালী যখন "লবনকাতরা" তে অভ্যস্ত হয়ে যাবে তখন তারা আর আলকাতরা ফ্রী দেবেনা। বলবে কিনতে হবে। কিনে খাও। বাংগালীরা তখন রং ফর্সা করতে "লবনকাতরা" কিনে খাবে। এখন যেমন অনেক জিনিশ কিনে।

পিংকির হাসবেন্ড কে নিয়ে কবিতা টা ভালো হয়েছে। ওতো বেশ লিখতে পারে। আসলে ফেইসবুকে সবাই টুক টাক লেখে। ভালো হয় সবার টা। মনের কথা গুলোই সবাই লেখে। দু'লাইন বা তিন লাইন। ছবিও দেও। খেলার ছবি, বেড়ানোর ছবি, ফুলের ছবি। খাবারের ছবিও অনেকে দেয়। বিয়ে বাড়িতে খাচ্ছে বা রেস্টুরেন্ট এ খাচ্ছে। ভালো লাগাটা সবার সাথে শেয়ার করে।

কেউ কেউ পছন্দের কাউকে নিয়ে কবিতা লিখে। সেদিন একটা কবিতা দেখে রীতিমত বৈদ্যুতিক শক খেলাম। কবিতাটি এরকম

"মন ভালো নাই,
কুত্তা খেদাই
কুত্তা ফিরে আসে বার বার
তোমাকে বেসেছি ভালো,
তুমি আসোনি
তুমি কুত্তার চেয়েও হারামী...."

আমি ক'বার পড়লাম কবিতাটি। প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করে লিখা। মন্দ না। ভালো উপমা দিয়ে লেখেছে। ভরবেগ, বেগ আবেগ সব আছে চার লাইনে। হা হা...। বেশ কয়েকটি লাইক ও কমেন্টস ও আছে। একজন কমেন্টস করেছে,
"কিরে আবুল ছ্যাখা দিছে নি, হুইতা রো...কি আর করবি..."।
আরেক জন লিখছে,
" অঁরে কমরেড, ছ্যাকা খাইতে খাইতে শহীদ হইয়া গেলিরে..."।

আবুল রিপ্লে দিয়েছে,

"কুত্তা তো, এই জন্য আসে নাই, মানুষ হইলে আসতো...ভালোবাসা বুঝলনা, আমার ছকিনা"।

যাহোক পিংকি কে বলেছিলাম তার হাসবেন্ড কে নিয়ে বিদেশ যাবার আগে যেনো দেখা করে একবার। বুঝলাম না হঠাৎ তারা বিদেশ কেন যেতে চাচ্ছে। মতলুব সাহেব ই নাকি বেশ আগ্রহী। তিনি পিংকি কে মোটিভেট করছেন কিছু একটা বলে। পিংকি দ্বিধান্বিত। মতলুব সাহেব পিংকি কে নিয়ে যাবেন। কি উদ্দেশ্য বুঝতে পাড়লাম না। একটা বাচ্ছা মেয়ে, মরণোন্মুখ স্বামী কে নিয়ে বিদেশ যাবে সাথে যাবে ননদের স্বামী যিনি কিনা আবার বংশ পরম্পরায় ঘরজামাই। একটু খঠকা লাগলো। তাছাড়া তার চলন বলন ও ভালো না। সেদিন পিংকি কে একা পেয়ে ঝাপটে ধরেছিলেন। তবে মেয়েটা ও এখন বেশ বুদ্ধিমতী হয়ে উঠছে। সে বিশ্বাস করেনি। তাই লুকিয়ে আমার পরামর্শ চেয়েছিলো যাবে কি না।

আমি যেতে বলেছি। আমার ভরসা হয়েছিলো মেয়েটার কথাবার্তা র উপর। যেহেতু সে পরামর্শ চেয়েছে, তার মানে সে সব পরিস্থিতি ই সামাল দিতে পারবে। যে কোন ব্যাপারে পরামর্শ চাওয়া ভালো। মতলুব সাহেব ওকে একটা স্বপ্ন দেখিয়েছেন, বলেছেন বিদেশের চিকিৎসা অনেক ভালো। অনেক সময় এদেশে ডাক্তার রা নাকি রোগ নির্ণয়ে ভুল করে। ভুল চিকিৎসা দেয়।

এগুলো আসলে সব বানোয়াট। একটা হীন উদ্দ্যেশ্য নিয়ে কিছু দালাল শ্রেনীর লোক এসব করে। আর রোগী বা তার আত্মীয় স্বজনের মন থাকে এসময় খুব দুর্বল। তারা এসবে বিশ্বাস করে, প্রতারিত হয়।

মতলুব সাহেব কে আমার কাছে একটা দালাল টাইপের লোক ই মনে হচ্ছে। সে নাকি প্রায় ই রোগী নিয়ে বিদেশ যান। বেকার ভবঘুরে লোকদের এই একটা কাজ। একটা ব্যবসাও বলা যায়। প্রায় সময় রোগী দের ভুং ভাং বলে ভাগিয়ে বিদেশ নেয়। এতে তাদের দুটো লাভ হয়। বিনে পয়সায় বিদেশ ভ্রমন হয়। আর দালালীর জন্য কিছু নগদ কমিশন ও পায়।

মতলুব সাহেব লোকটা ভালোনা। এখানে তার উদ্দ্যেশ্য খারাপ ভালো ঠেকছে না। মনে হচ্ছে সে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাচ্ছে। পিংকির উপর তার চোখ পড়েছে। সে যেভাবেই হোক নোমান আর পিংকি কে নিয়ে চিকিৎসার নাম করে বিদেশ যাবে।

(চলবে)

লেখক: ডা. সাঈদ এনাম । এম.বি.বি.এস (ডি এম সি) এম ফিল (সাইকিয়াট্রি) সাইকিয়াট্রিস্ট ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা। 

Post a Comment

Previous Post Next Post