কুলাউড়া জংশন - শরীফুজ্জামান চৌধুরী তপন

কুলাউড়া জংশন - শরীফুজ্জামান চৌধুরী তপন
শরীফুজ্জামান চৌধুরী তপন: জনপ্রিয় নাট্যকার কথাসাহিত্যিক উপন্যাসিক মরহুম হুমাযুন আহমেদের একটি বইয়ের নাম ছিল গৌরীপুর জংশন। সেই নামের আদলেই কুলাউড়া কেন্দ্রিক এই লেখাটির নাম কুলাউড়া জংশন। মানুষ তার উৎসের দিকেই ধাবিত হয়, মূল ছাড়া যেমন বৃক্ষ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা টিক তেমনি আমাদেরও মূল হলো উৎস হলো আমাদের জন্মমাটি; বিশেষ করে যেখানে আমরা বেড়ে উঠেছি যেখানের আলো বাতাসে আমরা শৈশব কৈশোর যৌবনের অনেকগুলো দিন কাটিয়ে আজ প্রবাসী। আমি মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যতীত অধিকাংশ প্রবাসীদের নিজের এলাকার প্রতি মানুষের প্রতি যে টান ভালোবাসা দেখেছি তা বর্ণনাতীত, বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মলাভের সময় থেকে এই ব্রিটেন প্রবাসীদের কি পরিমাণ অবদান তা অস্বীকার করলে সত্যের অপলাপ হবে, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ভালো খবরে এই প্রবাসীরা খুশি হন আর খারাপ খবরে ব্যথিত হন।
কুলাউড়া যখন আধো শহর আধো গ্রামের অবয়বে তখন আমি কুলাউড়ায় স্থায়ী হই। আমার বাবা তখন মৌলবীবাজার থেকে বদলি হয়ে কুলাউড়া আসেন যদিও আমরা কুলাউড়ার স্থায়ী বাসিন্দা (ঘাগটিয়া)। কিন্তু বাবার চাকরির সুবাদে আমরা মৌলবীবাজার থাকতাম। জীবনের একটা বড় অংশ আমরা কুলাউড়া ফুটবল মাঠের পাশে কাটিয়েছি, এখানে আমার বাবার একটি বাসস্থান ছিল (যেটা পরবর্তীতে আমরা বিক্রি করে দিয়েছি)। কুলাউড়ায় আমাদের আসার একমাত্র কারণ আমার বাবা মনে করতেন মৌলবীবাজার থেকে কুলাউড়ায় লেখাপড়া ভালো হয় এবং কুলাউড়ায় লেখাপড়ার পরিবেশ ভালো। যে কারণে আমার বাবা মৌলভীবাজারে আমাদের বাসার জায়গা বিক্রি করে কুলাউড়ায় বাসা তৈরি করেন আর আমরাও কুলাউড়ায় স্থায়ী হয়ে যাই। আমার বাবার কাছ থেকে খুব ছোটবেলা কুলাউড়া সম্পর্কে যা জানতে পেরেছিলাম তা হলো তৎকালীন মহকুমা শহর মৌলভীবাজার হলেও কুলাউড়ায় বিজলি বাতি মৌলবীবাজারের আগেই ছিল। কুলাউড়া রেলওয়ে রিক্রিয়েশন ক্লাবে একসময় একটি রেডিও ছিল। ওই আমলে তখন মানুষ বিভিন্ন দূর-দূরান্ত থেকে এসে এই রেডিওর খবর শুনতে। রেলপথের মাধ্যমে সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্রস্থল ছিল এই কুলাউড়া জংশন। এখান থেকে ট্রেন লাতু হয়ে আসাম পর্যন্ত যেতো আর চাঁদপুর পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে স্টিমার দিয়ে গোয়ালন্দ হয়ে মানুষ কলকাতা যেতো। পৃথিবীর যত বড় বড় শহর গড়ে উঠেছে তা একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। ব্রিটিশ আমল থেকেই যোগাযোগের জন্য আমাদের কুলাউড়া অগ্রসর ছিলো বিশেষ করে রেলপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চপদে আমাদের কুলাউড়িয়ান কর্তাব্যক্তি ছিলেন বিশেষ করে জনাব মনির আহমেদ, ডাব্লিউ চৌধুরী, আইয়ুব আলী তাদের কারণে কুলাউড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যুৎ অনেক আগেই পৌঁছে গিয়েছিলো। জেলা শহর এর সঙ্গে মরহুম সাইফুর রহমান প্রথম অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তির পর সর্বপ্রথম কুলাউড়া মৌলবীবাজার রাস্তা একরাতে পাকাকরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। উপজেলা সদরের সঙ্গে প্রত্যেকটি ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত এবং প্রায় সব রাস্তাগুলি পাকা। আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি যারা বিভিন্ন সময়ে আমাদেরকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বা যারা প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে ছিলেন সবার মধ্যেই কুলাউড়ার উন্নয়ন নিয়ে একটা সমঝোতা ছিল যা এখনো আছে। এ ব্যাপারে দলমত নির্বিশেষে সবাই এক ও অভিন্ন থাকলে যেকোনো এলাকাই উন্নত হতে পারবে।
কুলাউড়ার স্মৃতি কথা লিখতে গিয়ে অনেক কথাই মনের জানালায় ভিড় করছে ভাবছি কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখি! আমাদের শৈশবের কুলাউড়ায় বিনোদনের জন্য দুটি সিনেমা হল ছিল। কি যে কষ্ট করে পুরোনো পেপার বিক্রির টাকা দিয়ে আমরা সিনেমা দেখতে যেতাম লুকিয়ে; তবুও লোকানো  ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতো যখন মুরুব্বি স্থানীয় কেউ দেখে ফেলতেন তখন মা বাবার কাছে খবর চলে আসতে বেশি সময় লাগতোনা কিংবা আমাদের স্কুলের শিক্ষকদের কাছে খবর চলে যেত। প্রতিবছর রেলওয়ে রিক্রিয়েশন ক্লাবে নাটক হতো, সেই নাটকে আমাদের অনেক বন্ধু-বান্ধবের বাবারা অংশ নিতেন এর পাশাপাশি আমাদের শ্রদ্বেয় শিক্ষক চন্দন স্যার, মোজাম্মেল ভাই, মনা ভাইসহ অনেকের অভিনয় দক্ষতা আমাদের কাছে কিংবদন্তির মতো ছিল। ছোটবেলা মনে হতো ইস আমি যদি তাদের মতো অভিনয় করতে পারতাম! আসলে এই নাট্যচর্চার কারণেই কুলাউড়ায় আজ অনেক নাট্য সংগঠন গড়ে উঠেছে। আমাদের সময়ে আরেকটি মজার বিষয় ছিল বিশেষ করে দক্ষিণ বাজার মসজিদের বিপরীতে একটি আমগাছ ছিল সেই আম গাছের সাথে বাই সাইকেল দাঁড় করানো থাকতো, আর এর সাথেই ছিল লস্করপুরের মতি ভাইয়ের সাইকেল রিপেয়ারের দোকান। উনার কাছ থেকে সাইকেল ভাড়া নিয়ে এক ঘণ্টা দুই টাকায় নিয়ে আমরা হাওয়ায় ভেসে বেড়াতাম। বেশিরভাগ সময় দেরি করে ফিরলে মতি ভাই অনেক সময় রাগ করতেন কিন্তু পরে হাসি মুখে মেনে নিতেন বা পঞ্চাশ পয়সা বেশি চার্জ করতেন। সপ্তাহে এক দুই দিন আমার নিয়মিত ছিল সাইকেল চালানো। সাইকেল থেকে পরে গিয়ে অনেকবার হাত পা কেটে গেছে কিন্তু সাইকেল চালানো বাদ দেইনি।
কুলাউড়ায় লালসূর্য্য খেলাঘর, তরুণ সংঘ, সমস্বর, রেলওয়ে বয়েজ ক্লাব, টাউন ক্লাব, রাইজিং স্টার ক্লাব এসবই খেলাধুলা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে নিয়োজিত ছিল। সম্ভবত এসব কর্মকা-ের ফলেই জাতীয় পর্যায়ে ও আমাদের কুলাউড়ার সু-সন্তানরা এসব ক্ষেত্রে অবদান রাখতে সমর্থ হয়েছেন। আমাদের মধ্যে উত্তর আর দক্ষিণ কেন্দ্রিক বিভাজন ছিল মারামারি পর্যন্ত হয়ে যেত কিন্তু আবার মিলও ছিল। সম্পর্ক বেশিক্ষণ খারাপ থাকতো না। দক্ষিণ বাজারে মনসুরের মানুষের প্রভাব আগে ছিল এখনো আছে, স্টেশন রোডে জয়পাশার মানুষেরও একই রকম প্রভাব ছিল এখনো আছে, উত্তর বাজারে বিহালা বিসরাকান্দির মানুষদের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। পূবালী সিনেমাহল থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত চৌমহনী চাতলগাঁও আলালপুর উসলাপাড়ার প্রভাব আগেও ছিল এখনো আছে তবে এসব মিলিয়েই আমরা কুলাউড়িয়ানরা একে অন্যের সঙ্গে স্নেহে মায়ায় মমতায় এক ও অভিন্ন ছিলাম এবং এটাই আমাদের বিশেষত্ব ছিল। আজ প্রবাসে থাকার কারণে হয়তো সবার সঙ্গে যোগাযোগ হয়না দেখা হয়না কিন্তু মনজগতে আজ থেকে বিশ বছর আগে যে কুলাউড়া ছেড়ে এসেছিলাম আজো তা অবিকৃত আছে। যতদিন বেঁচে থাকবো একজন গর্বিত কুলাউড়িয়ান হিসেবেই যেন বেঁচে থাকি এই প্রত্যাশাই করি মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে, সবার মঙ্গল কামনা করি।

Post a Comment

Previous Post Next Post