প্রসঙ্গঃ কুলাউড়ায় মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ প্রতিষ্ঠা

প্রসঙ্গঃ কুলাউড়ায় মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ প্রতিষ্ঠা
মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলামঃ আবহমানকাল ধরে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কুলাউড়ার মানুষ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিকাশের প্রতিটি পরতে এ অঞ্চলের মানুষের ভূমিকা ছিল গৌরবময়। এ ব্যাপারে ইতিহাস সাক্ষী দেবে। কিন্তু যাদের রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি তাদের পরিবারের সদস্যদের পার্থিব কিছু দিতে পারি বা না পারি তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কিছুই কি করতে পারিনা? যাতে এ প্রজন্ম ও পরর্বতী প্রজন্ম ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে পারে। এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান, সম্মানী ও তাদের সন্তানদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেয়ায় সরকারের প্রতি জাতি কৃতজ্ঞ। এর পাশাপাশি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে ও বধ্যভূমিগুলোতে স্মৃতি সৌধ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা ও রাস্তার নামকরণ করাটাও জরুরি। এতে মুক্তিযুদ্ধ মানুষের মাঝে সজীব হয়ে উঠবে প্রতিটি মুহুর্তে আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হবে ইতিহাসের পরিক্রমা ।
২৫ মার্চ কালো রাতে আপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে শুরু হয় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বাঙালি নিধন। অসংখ্য মানুষকে নির্মম হত্যার পর বধ্যভূমিগুলোতে মাটি চাপা দিত আর সারা বাংলাকে পরিণত করেছিল বধ্যভূমিতে। সারা দেশে অনেক  বধ্যভূমি আবিষ্কৃত হলেও এখনও অনাবিষ্কৃতি রয়েছে বহু বধ্যভূমি। সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করা জরুরি। কুলাউড়ার বধ্যভূমি  ও নির্যাতন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- কুলাউড়া থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, চাতলগাঁও গোরস্তান, নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যায়ের দক্ষিণে, নবীন চন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের বিপরীতে রেললাইনের পূর্ব পাশে চিড়ল নামের এক রুহিদাসের বাড়ি ও রেল স্টেশনের দক্ষিণ পাশে বধ্যভূমিগুলোর অবস্থান। পৃথিমপাশার ফানাইনদী, আলী আমজাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের  উত্তর পাশে হাসপাতালের দক্ষিণের পুকুর পাড়, পদ্মদিঘির পাড় খাদ্য গোদাম সংলগ্ন, রবিরবাজার ও সদপাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়েও বহু লোককে হত্যা করা হয়েছে। আলীনগর সম্মুখ সমর ক্ষেত্র ও গগনটিলা যুদ্ধক্ষেত্র। এছাড়াও আরে অজানা মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিবিজরিত স্থান রয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে স্মৃতিসৌধ বা স্মৃতিস্তম্ভে সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে ভাবীকালের মানুষ ও  ইতিহাস চর্চাকারীদের মুক্তিযুদ্ধকে জানার সুযোগ করে না দিলে একদিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। বর্তমান সময়ে যে হারে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীশক্তি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এটমবোমার মতো সুপ্ত অবস্থায় আছে তা যেকোনো সময়- সুযোগ বুঝে প্রতিক্রিয়াশীলতার বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। কুলাউড়া সদরে স্বাধীনতার স্মৃতিসৌধ বেশ ক’বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছে। রবিরবাজার বধ্যভূমিতে একটি  অসর্ম্পূণ স্মৃতিসৌধ রয়েছে চরম অবহেলায়।
‘যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তিসেনা দে না তোরা দে না সে মাটি আমার অঙ্গে মাখিয়ে দে না’ অসংখ্য শহীদ ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শুয়ে আছে কুলাউড়ার এ ভূমিতে। অনেকের পরিচয় জানা গেলেও অজ্ঞাত রয়েছে অজস্র শহীদ। এঁদের মধ্যে- কুলাউড়া উপজেলায় ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন আব্দুর রহমান, ম্যানেজার, আজম বোর্ডিং, হালিম উল্লাহ্্, শামসুল আলম, রাজনগর, আসদ আলী, আওয়ামী লীগ নেতা, ডা. সিকান্দর আলী, আতা উল্লাহ, হাজির আলী, রঙ্গিরকুল, সিতেশ চন্দ্র দেব, মাগুরা, বিধান কৃষ্ণ সোম, কাদিপুর, সত্যরঞ্জন দাশ,কমলগঞ্জ, নৃপেশ রঞ্জন দাস, কমলগঞ্জ, আব্দুর নূর খান,বাহাদুরপুর, নূর মোহাম্মদ, স্টেশন রোড, সিরাজুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ কর্মী, নূর হোসেন, শমসেরনগর, নেছার আহমদ, সাগরনাল, আব্দুল লতিফ, নগেন্দ্র দাশ, সুুরেন্দ্র বৈদ্য, পুসাইনগর, মতি মিয়, বিহালা, বিনোদ বিহারী ধর, রঙ্গিরকুল, সুকুমার চৌধুরী, গুরাভূঁই, সৈয়দ সিরাজল আজাদ, হবিগঞ্জ (পাল্লাকান্দি থেকে ধরে নিয়ে যায়), আব্দুর রহিম, বটনীঘাট, আরজু মিয়া (মুক্তিযোদ্ধা), উত্তর পল্্কী, ধ্রুবজ্যোতি দত্ত (যুদ্ধে শহীদ), সালন, হবিব উদ্দিন, আব্দুর রহিম, শহর উল্লাহ্্, আব্দুস শুকুর, আসকর আলী, সগীর আহমদ, বশির উদ্দিন, আব্দুল মালিক, সিরাজ উদ্দীন, জহির উদ্দিন, আব্দুল আলী, আব্দুস শহীদ, ইয়ানুর, আতাউর রহমান, নূরুল ইসলাম ভূঁইয়া, ছাত্রলীগ নেতা, এখলাছুর রহমান, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা, আব্দুল আলী, রেল কলোনির বাসিন্দা, মফিজ আলী, আব্দুল হামিদ, সিরাজ উদ্দীন এবং অজ্ঞাত পরিচয় চারজন। এছাড়া আরো ৫০ জন নাম না জানা ব্যক্তিকে চিড়ল দাশের বাড়িতে এনে হত্যা করা হয়েছে। 
কুলাউড়া গ্রাম- ছলিম উল্লাহ, আরশদ আলী, সিকান্দর আলী, সোনাপুরের আশিদ আলী, আতাউল্লাহ্্ সহ ১৩ জন। আব্দুল কুদ্দুছ, কটু মিয়া, সিরাজুল ইসলাম সহ দু’জন।
কাদিপুর- ননু মিয়া, ধীরেন্দ্র চন্দ্র শীল, হোসেনপুর, আমির উদ্দীন এবং আরো দু’জন কৌলারশি, পুসাইনগরে- দিগেন্দ্র চন্দ্র দেব, সুরেন্দ্র চন্দ্র দেব (জয়চ-ী), নরেশ চন্দ্র ঘোষ, উপেন্দ্র ঘোষ, অনিল ঘোষ, প্রসন্ন কুমার দাস, মতছির আলী, মহেন্দ্র শুক্লবৈদ্য, মথুরা দাশ, চিত্তরঞ্জন দাশ, হরেন্দ্র মালাকার, দিগেন্দ্র কুমার দাশ এবং অন্যান্য।
ঘাগটিয়া- আব্দুল মান্নান, আব্দুর রহমান, আইজ মিয়া ফরিদ উদ্দীন, মইন মিয়া (গাজিপুর), সুলতান আহমদ (কামারকান্দি)।
পৃথিমপাশা- আবুল মিয়া, রেহান মিয়া, অজ্ঞাত পরিচয় রিকশা চালক, রবু উল্লাহ্, ডা. কুমুদ রঞ্জন দেব (সদপাশা) প্রহ্লাদ মাস্টার ও তার এক ভাই, কুনুর মিয়া, নমই উল্লাহ্্ (দিঘলকান্দি), সগির আহমদ (ভাটগাঁও, মুক্তিযোদ্ধা, শুকনা ছড়ার পাড়ে অবহেলিত সমাধি), বশির উদ্দীন (মনরাজ, মুক্তিযোদ্ধা), আব্দুল খালিক তহশিলদার, নরেন্দ্র নাথ (বিজলী) সহ শতাধিক শহীদ হন পৃথিমপাশায়।
কলিরকোনা- মকরম উল্লাহ্্, আইন উদ্দিন, আব্দুস সাত্তার, মকদ্দছ আলী ও ক্ষীতিশ (চা দোকান র্কমচারি), পদ্মদীঘিরপাড়ে ও আছলিমকে (জয়পাশা) সদপাশা স্কুলে হত্যা করা হয়।
কর্মধা- আব্দুর রহমান মুন্সি, টাট্টিউলি, আত্তর আলী, বুধপাশা, আব্দুল মালিক (কামার কান্দি), আব্দুল হাই, রেলওয়ে হিসাব রক্ষক।
রাউৎগাঁও- আব্দুর রহমান মুনশি, মনরাজ, ডা. অক্ষয় কুমার দেব, অ্যাডভোকেট রাম রঞ্জন ভট্টাচার্য, পবিত্র ধর, নর্তন, শফি আহম্মদ চৌধুরী, রেলওয়ে চিফ প্ল্যানিং অফিসার, সৈয়দ তজমুল আলী, পুলিশ অফিসার ও আব্দুল মান্নান (কাদির), ইঞ্জিনিয়ার, গাজীপুর অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি।
হাজিপুর- আরজু মিয়া (মুক্তিযোদ্ধা), অজ্ঞাত মুক্তিযোদ্ধা মনু অপারেশনে ধরা পড়ে, শুকুর মিয়া (মুক্তিযোদ্ধা), সিরাজুল ইসলাম, ধ্রুবজ্যোতি দত্ত (মুক্তিযোদ্ধা), কটাই মিয়া, আসগর আলী (মুক্তিযোদ্ধা), সিরাজ উদ্দীন (মুক্তিযোদ্ধা), জহির উদ্দীন (মুক্তিযোদ্ধা), আব্দুল আলী (মুক্তিযোদ্ধা), আবদুস শহীদ (মুক্তিযোদ্ধা), ইয়ানুর আলী (মুক্তিযোদ্ধা), আতাউর রহমান (মুক্তিযোদ্ধা)।
বরমচাল- আবদুল আহাদ চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা, রমণী মোহন ভট্টাচার্য, শরৎ উল্লাহ্্, মখলিছ মিয়া, সুনীল পাল, পনু মিয়া, শহর উল্লাহ্ (মুক্তিযোদ্ধা), নন্দন নগর।
ব্রাহ্মণবাজার- সিরাজুল ইসলাম, হিঙ্গাজিয়া, গুরুদাস দাত্ত  (পোস্ট মাস্টার), ননী দেব, প্রণয় কুমার দেব, নিয়ামত আলী, উত্তর হিঙ্গাজিয়া, মনছব আলী, ইউপি সদস্য, দ্বিজেন্দ্র সূত্রধর, দেবল দেব, কটাই মিয়া, শংকর দেব, হিঙ্গাজিয়া, সত্যব্রত দাস ও নৃপেশ দাশ, কমলগঞ্জ, হিঙ্গাজিয়ায় হত্যা করা হয়।
সরকরি, বেসরকারি ও ব্যক্তি র্পযায়ে আরো বিশদ গবেষণা করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় সংগ্রহ করে সমাধি সৌধ-স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা সময়ের দাবি। এছাড়া রাস্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করে তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের জাতীয় কর্তব্য। কুলাউড়া উপজেলায় এরকম সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি স্থানে এ ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথ চলা শুরু হোক।
তথ্যসূত্রঃ সিলেটে গণহত্যা, তাজুল মোহাম্মদ।
মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম: প্রভাষক, লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজ।

Post a Comment

Previous Post Next Post