ইমাদ উদ দীন: এ অঞ্চলের পাহাড়ী টিলার বনই মায়া হরিণের অভয়ারণ্য।এমন সুখ্যাতি আর ঐতিহ্য র্দীঘ দিনের। কিন্তু তা ধরে রাখা যাচ্ছেনা নানা কারণে। মহা হুমকিতে পড়েছে এই বন্যপ্রাণীটির জীবন ও জীবীকা। এমন সংকটে এখন ওদের পরিসংখ্যান কমছে দিন দিন। আর একারণে বিলিন হওয়ার ভয়ে উদ্বিগ্নতা বাড়ছে প্রাণী বিশেষজ্ঞদের।তাদের পরামর্শ সমস্যা লাগবে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার।মায়া হরিণ এ জেলার পাহাড়ী অঞ্চলের অতি পরিচিত প্রাণী। দেখতে নাদুস নুদস আর মায়াবী প্রাণীটিকে স্থানীয়রা “ছাগলীয়া হরিণ” বলেই চিনেন। দেখতে ছাগলের মত হওয়াতেই তাদের এই নামকরণ। মৌলভীবাজারের পাহাড়ী টিলাগুলোতে ওদের অবাদ বিচরণ। চা বাগান আর টিলার বন জঙ্গলেই তাদের নিরাপদ ঠাঁই। তাই দলবদ্ধ কিংবা দলছুট হয়ে এসকল স্থানে ওদের দৌঁড় ঝাঁপ। মনোহর এমন দৃশ্য এখনো চোখে পড়ে প্রায়ই। কিন্তু সংশ্লষ্টি সকলের অবহেলায় মায়া হরিণের অভয়ারণ্য হিসেবে এ অঞ্চলের এমন খ্যাতি প্রতিনিয়তই ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। বনে ঠাঁই নেই। তাই জীবন বাঁচাতে লোকালয়ে এসেই জীবন যাচ্ছে তাদের। আগে দল বেঁধে ওদের খাবার সংগ্রহের দৌঁড় ঝাঁপ দৃষ্টি কাড়ত স্থানীয়দের। এখন মানব সৃষ্ট দানবীয় আচরণে খাদ্য আর নিরাপদ বাসস্থানহীনতায় মহা সংকটে মায়া হরিণ।এ অঞ্চলের অতি পরিচিত প্রাণীটি এখন নানা কারণে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। এমনটিই ধারণা সংশ্লিষ্ট বিশেজ্ঞদের।স্থানীয়রা জানান এখনও প্রায়ই দেখা যায় টিলার বনের পাশে দল বেঁধে ঘুরে মায়া হরিণ।তবে কোন কোন সময় দলছুট হয়ে লোকালয়ে আসলেই মানুষের হাতে প্রাণ যায় ওদের। তবে অনেক সময় তা জানা জানি হলে বনবিভাগের তৎপরতায় মৃত্যু থেকে রক্ষামেলে। তারা জানালেন স্থানীয় কিছু লোভী মানুষ নানা কৌশলে ফাঁদ পেতে শিকার করে হরিণ। এরা গভীর বনে হরিণের অবাদ বিচরণের এলাকায় এমন শিকার চালায়। স্থানীয় ওই শিকারিরা এত র্দূত যে কেউ টের পাওয়ার আগেই দ্রুত ওরা সব কাজ সেরে ওই স্থান থেকে চম্পট দেয়। আজ একস্থানে শিকার কার্যক্রম চালালে পরের দিন চালায় অন্য জায়গায়। অবস্থা বুজে সপ্তাহ দিন কিংবা মাস দিন পরেও শিকারে নামে। চতুর এই শিকারিরা এতই অভিজ্ঞা সম্পন্ন তারা নানা প্রজাতির গাছ ও হরিণের পদ চিহ্ন দেখেই তাদের বাসস্থানের সন্ধান পায়। তাদের এমন হীন কর্মে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মায়া হরিণের অভয়ারণ্য।স্থানীয়দের অভিযোগ বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশের কারণেই হরিণ শিকারিরা বেপরোয়া। তবে তা মানতে নারাজ বন বিভাগের কর্মকর্তারা। বরং এক্ষেত্রে তাদের জনবল, অস্ত্রসহ নানা সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করে তারা জানান হরিণ শিকারি ও গাছ চোরদের ধরে জেল হাজতে দিলে আইনের ফাঁক ফুঁকরে ছাড়া পেয়ে ওরা আরো বেপরোয়া হয়ে যায়। আর লোকবল কম থাকায় বিশাল এই বন দেখভাল অনেকটা অসাধ্য হয়ে উঠে। স্থানীয় বন বিভাগ সুত্রে জানা যায় গত ১১ মাসে ৯টি মায়া হরিণ ও একটির চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে। গত ডিসেম্ভর থেকে চলতি মাস পর্যন্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বন বিভাগ ৯টি হরিণ উদ্ধার করে। এর মধ্যে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীবাড়ি সড়ক থেকে একটি হরিণ উদ্ধার হয়।
৩১ জানুয়ারি এম আর খান টি এস্টেট থেকে একটি মাদি হরিণ। ২৫ এপ্রিল জুড়ীর সাগরনাল চা-বাগান থেকে মায়া হরিণ। ২৭ মে বেড়াছড়া থেকে জবাইয়ের আগ মুহূর্তে শিকারির কবল থেকে উদ্ধার হয় একটি হরিণ। ১৬ জুন কুলাউড়ার বুধপাশা থেকে উদ্ধার হয় একটি মায়া হরিণ। ২০জুলাই কালাছড়া বিটের করিমগঞ্জ এলাকা থেকে একটি হরিণ। ৭ সেপ্টেম্বর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি-৪৬) বিওপির একটি দল কমলগঞ্জের আদমপুরের সংরক্ষিত বন এলাকা থেকে জবাইয়ের আগ মুহূর্তে উদ্ধার হয় মাদি হরিণ। ১০ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাইটোলা গ্রামে জবাই করা মায়া হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়। ২১ সেপ্টেম্বর কমলগঞ্জের কুরমা-চাম্পারা থেকে উদ্ধার হয় মায়া হরিণ। ১১ নভেম্বর লাউছড়া বনের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা শ্রীমঙ্গল কুলাউড়া সড়কে বাস চাপায় আহত মায়া হরিণ উদ্ধার করা হয়। তাছাড়া লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনের মধ্যে দিয়ে রেল ও সড়ক পথ পারাপারে মারা যায় হরিণসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। সুস্থ কিংবা আহত উদ্ধার হওয়া এসকল বন্যপ্রাণী চিকিৎসা শেষে লাউয়াছড়ায় অবমুক্ত করা হয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)র মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়ক আ.স.ম ছালেহ সুহেল ও মৌলভীবাজার জেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সৈয়দ মহসীন পারভেজ ও সম্পাদক নরুল মোহাইমিন মিল্টন বলেন বনদস্যুদের কবলে পড়ে বনসম্পদ উজাড় হওয়ায় এর বিরুপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশ,প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের উপর।তারা এখানকার বনের ঐতিহ্য মায়া হরিণসহ বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের আরো সচেতন হয়ে এগিয়ে আসার আহবান জানান।এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি প্রবীণ আইনজীবী এডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব বলেন এ অঞ্চলের বনাঞ্চলের ঐতিহ্য মায়া হরিণসহ বন্যপ্রাণী মানব সৃষ্ট সংকটে পড়ে তাদের জীবন জীবীকা যে ভাবে ধ্বংসের দোরগোড়ায় পৌঁচাচ্ছে সে জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধের আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন। তিনি এজন্য বন আইনের যুগোপযোগী সংশোধন ও স্বতন্ত্র বন আদালতেরও দাবী জানান। বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের (শ্রীমঙ্গল) সহকারী বন সংরক্ষক মো.তবিবুর রহমান বলেন, এই অঞ্চলটি মায়া হরিণের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। কিন্তু দিন দিন দুষ্টচক্রে বন ও গাছগাছালি উজাড় হওয়ার কারণে এখন ওদের খাবার ও বাসস্থান সংকটে পড়েছে। গভীর বনে বন প্রহরীদের ফাঁকি দিয়ে যেমন শিকারিরা নিধন করছে হরিণ তেমনি খাদ্য সংকটে লোকালয়ে এসেও প্রাণ যাচ্ছে ওদের। তিনি এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই প্রাণীটি রক্ষায় সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানান।


